তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরু ছবি : সংগৃহীত

পঞ্চগড় প্রতিনিধি: পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ চত্বরে এক নারীর পথ আটকে ফেসবুক লাইভে ‘ঘুষের টাকা’ ফেরত চাওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচিত সেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরুকে অবশেষে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁকে ইউএনও পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে সংযুক্ত (ওএসডি) করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।
গত বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব গোলাম মোর্শেদ স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই আদেশ দেওয়া হয়। তবে বিষয়টি আজ রোববার বিকেলে জানাজানি হয়। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করা হবে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৯ জুন। সেদিন দুপুরের পর তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ চত্বর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু। সে সময় আকস্মিকভাবে তাঁর পথ আগলে দাঁড়ান রেহেনা বেগম ঊর্মি নামের স্থানীয় এক নারী। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর ‘ঊর্মি আক্তার’ নামের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভ শুরু করেন এবং ইউএনওর কাছে ঘুষ হিসেবে দেওয়া ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ফেরত চান।
ভিডিওতে দেখা যায়, ইউএনও ওই নারীকে চেনেন না বলে দাবি করছেন এবং একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রেহেনা বেগম বারবার তাঁর টাকা ফেরত দেওয়ার আকুতি জানাতে থাকেন। ৯ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের এই লাইভ ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায় এবং ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
লাইভ করার দিনই সন্ধ্যা সাতটার দিকে ভুক্তভোগী রেহেনা বেগম পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসকের কাছে ইউএনওর বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তাঁর ছেলেকে গ্রাম পুলিশের চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু তাঁর কাছ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন। চাকরি না হওয়ায় সেই টাকা ফেরত চাইলে ইউএনওর পক্ষ থেকে তাঁকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছিল। টাকা উদ্ধারের আর কোনো উপায় না পেয়েই তিনি জনসমক্ষে ফেসবুক লাইভ করতে বাধ্য হন।
ফেসবুক লাইভের ঘটনার পর দিন অর্থাৎ ৩০ জুন তেঁতুলিয়ায় ইউএনওর পক্ষে দুটি পৃথক মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। সকালে উপজেলা পরিষদ চত্বরে ‘বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী’ এবং সন্ধ্যায় উপজেলা শহরের তেঁতুলতলায় ‘সর্বস্তরের জনগণ ও সাংস্কৃতিক কর্মীবৃন্দ’ ব্যানারে এসব মানববন্ধন করা হয়। সেখান থেকে ইউএনওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ জানিয়ে ওই নারী এবং তাঁর ইন্ধনদাতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি তোলা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বুধবার তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহায়ক মো. মনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে তেঁতুলিয়া মডেল থানায় রেহেনা বেগমের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৬ জনকে আসামি করে সাইবার সুরক্ষা আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ইউএনওর পথরোধ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ আনা হয়।
এদিকে মামলার পর এবং প্রভাবশালীদের ক্রমাগত হুমকির মুখে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী রেহেনা বেগম। টিকটক ও রিলস ভিডিও তৈরি করা রেহেনা বেগম তেঁতুলিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মাগুরা এলাকার বাসিন্দা। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, মামলার পর থেকে গ্রেফতারের ভয় এবং বিভিন্ন মহলের হুমকিতে তিনি বাড়িতে ফিরতে পারছেন না এবং পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই লঙ্কাকাণ্ডের আগেই গত ২৪ জুন রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে আফরোজ শাহীন খসরুকে তেঁতুলিয়া থেকে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বদলির একটি আদেশ হয়েছিল। কিন্তু তারাগঞ্জে যোগদানের আগেই ঘুষ কেলেঙ্কারির এই ঘটনাটি ঘটে। ফলে সরকার তাঁর বদলির আদেশ বাতিল করে সরাসরি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এ বিষয়ে আজ সন্ধ্যায় ওএসডি হওয়া ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু গণমাধ্যমকে বলেন, “গত শুক্রবার আমি চিঠিটি পেয়েছি। তবে আমাকে ঠিক কোন তারিখে বর্তমান দায়িত্ব ছেড়ে চলে যেতে হবে, তা সেখানে সুনির্দিষ্ট করা নেই। জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে যেদিন আমাকে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হবে, আমি সেদিনই চলে যাব।”
ঘুষের টাকার দাবিতে ফেসবুক লাইভ এবং পরবর্তীতে ইউএনওকে প্রত্যাহারের এই ঘটনাটি বর্তমানে পঞ্চগড়সহ দেশজুড়ে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।