বাঁয়ে প্রকৃত ছবি, ডানে এআই দিয়ে বদলে দেওয়া ব্রাজিলের জার্সি ছবি: সংগৃহীত

ফুটবল বিশ্বে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মধ্যকার চিরবৈরী সম্পর্কের কথা সবারই জানা। মাঠের লড়াই ছাড়িয়ে দুই দলের সমর্থকদের এই উন্মাদনা মাঝে মাঝেই রূপ নেয় ভিন্ন মাত্রায়। তবে এবার সেই ফুটবল উন্মাদনার এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন বহিঃপ্রকাশ ঘটল খোদ পুলিশ প্রশাসনে। বরিশালে গ্রেপ্তার হওয়া এক মাদক কারবারির গায়ে থাকা আর্জেন্টিনার জার্সি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে পরিবর্তন করে ব্রাজিলের জার্সি বানিয়ে দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে।
এই কাণ্ডজ্ঞানহীন ডিজিটাল কারচুপির অভিযোগে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) এক উপপরিদর্শককে (এসআই) শোকজ (কারণ দর্শানোর নোটিশ) করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে বিএমপির মিডিয়া সেল ও সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের দায়িত্ব থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে বরিশাল নগরীর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদপুর কলোনি এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে কাউনিয়া থানা-পুলিশ। এই অভিযানে ৮০০ পিস ইয়াবাসহ রাসেল হাওলাদার (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, ধৃত রাসেল ওই অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত।
কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সনজীত চন্দ্র নাথ জানান, গ্রেপ্তারের সময় রাসেলের গায়ে আর্জেন্টিনার একটি জার্সি জড়ানো ছিল। গ্রেপ্তারের পর নিয়ম অনুযায়ী অফিশিয়াল ছবি তোলার সময় তাঁর গায়ের জার্সিটি উল্টো করে পরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর সেই ছবিসহ একটি প্রতিবেদন বিএমপির মিডিয়া সেলে পাঠানো হয়েছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা যায়, কাউনিয়া থানা থেকে ছবি ও তথ্য বিএমপির মিডিয়া সেলে পৌঁছানোর পর সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই তানজিল আহমেদ ছবিটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। তিনি ডিজিটাল এডিটিংয়ের মাধ্যমে রাসেলের গায়ের উল্টো করা আর্জেন্টিনার জার্সিটি সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে সেখানে ব্রাজিলের জাতীয় ফুটবল দলের জার্সি বসিয়ে দেন।
পরবর্তীতে এই বিকৃত বা এডিটেড ছবিটিই অফিশিয়াল সংবাদ বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে যুক্ত করে ই-মেইলের মাধ্যমে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংবাদিকদের কাছে পাঠানো হয়। শুধু তাই নয়, বিএমপির অফিসিয়াল সাংবাদিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও এই এআই-জেনারেটেড ছবিটি শেয়ার করা হয়।
সংবাদমাধ্যমে ছবিটি আসার পরপরই সাংবাদিকদের মনে খটকা লাগে এবং বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। পুলিশের মতো একটি দায়িত্বশীল বাহিনীর অফিশিয়াল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমন এডিটেড ছবি ব্যবহার নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বিষয়টি বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের নজরে আনেন।
ঘটনাটি জানার পরপরই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমে পাঠানো সেই বিকৃত ছবিটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে আসামির আসল ছবি যুক্ত করে নতুন করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ইস্যু করা হয়।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. আশিক সাঈদ মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত এসআই তানজিল আহমেদ ছবি পরিবর্তনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তানজিলের দাবি, ফুটবল নিয়ে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে যে তুমুল উন্মাদনা ও আগ্রহ থাকে, তা বিবেচনা করেই নিছক কৌতূহলবশত তিনি এই কাজটি করেছিলেন।
তবে পুলিশ কমিশনার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এই ধরনের আচরণ ‘গুরুতর পেশাগত অসদাচরণ’ (Professional Misconduct)। তিনি বলেন, “অভিযুক্ত এসআই তানজিল আহমেদকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। তাঁর জবাব পাওয়ার পর বিভাগীয় বিধি ও আইন অনুযায়ী পরবর্তী কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
এই ঘটনার পর বরিশাল অঞ্চলের সাংবাদিক এবং সচেতন মহলের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রযুক্তিকে ইতিবাচক কাজের পরিবর্তে আসামির ছবি বিকৃতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ব্যবহার করায় পুলিশের আইটি ও মিডিয়া সেলের তদারকি আরও বাড়ানোর দাবি উঠেছে।