সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ বাড়ল ৪১ শতাংশ, এক বছরেই জমা ১২ হাজার কোটি টাকা - Uttorpatro TV সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে ৪১% | Swiss Bank BD Deposit 2025

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ বাড়ল ৪১ শতাংশ, এক বছরেই জমা ১২ হাজার কোটি টাকা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 18, 2026
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক ছবি: সংগৃহীত

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে (সুইস ব্যাংক) বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানে আকাশচুম্বীভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’ (এসএনবি)-এর প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশিদের আমানত প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে, যা দেশের অর্থনীতিবিদদের মনে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

সুইস ব্যাংকের হিসাব অনুসারে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষ নাগাদ সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট জমা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ (সুইজারল্যান্ডের স্থানীয় মুদ্রা)। অথচ এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই জমার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ।

বাংলাদেশি মুদ্রায় এই হিসাবটি বেশ বিশাল। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এক সুইস ফ্রাঁর মূল্য ১৫২ থেকে ১৫৩ টাকা। প্রতি সুইস ফ্রাঁ গড়ে ১৫২ টাকা হিসাব করলেও ২০২৫ সাল শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের পর গত বছরই (২০২৫ সাল) বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে এই ইউরোপীয় দেশটির ব্যাংকগুলোতে। গত ১০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ জমার রেকর্ড।

এই অর্থের উৎস ও বৈধতা কতটুকু?

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশ থেকে জমা হওয়া এই অর্থকে সেই দেশের ‘দায়’ বা লাইবিলিটি হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। তবে অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুইস ব্যাংকে রাখা সব অর্থই যে অবৈধ বা পাচার করা, তা ঢালাওভাবে বলা যাবে না।

সুইস ব্যাংকে মূলত তিনভাবে বাংলাদেশিদের অর্থ জমা হয়: ১. ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আমানত। ২. বাংলাদেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক কর্তৃক বৈধ উপায়ে রাখা বৈদেশিক মুদ্রা। ৩. বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপার্জিত অর্থ, যা তারা সুইস ব্যাংকের বিভিন্ন গ্লোবাল শাখায় জমা রাখেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈধ উপায়ের চেয়ে অবৈধ পথে অর্থ সরানোর প্রবণতাই এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির মূল কারণ হতে পারে।

‘কমেনি অর্থ পাচার’– অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ

এসএনবির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২ এবং ২০২৩ সালে টানা দুই বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছিল। ওই দুই বছর আমানতের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে সাড়ে ৫ কোটি এবং পৌনে ২ কোটি সুইস ফ্রাঁ। কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার আবহে এই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল দেশ থেকে হয়তো অর্থ পাচার কমবে। কিন্তু সুইস ব্যাংকের এই নতুন হিসাব প্রমাণ করছে যে, বাস্তবে অর্থ পাচার কমেনি। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক একটি বার্তা।”

তিনি আরও যোগ করেন, অর্থ পাচারকারীরা কেবল সুইজারল্যান্ডকেই এখন নিরাপদ মনে করছে না। বিশ্বের অন্যান্য ট্যাক্স হ্যাভেন বা অফশোর অঞ্চলেও বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে, যার সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন। এখন বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই পাচার বন্ধ করা এবং পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।

পটপরিবর্তন ও অর্থ স্থানান্তরের সংযোগ

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন আসে। তৎকালীন সরকারের অনেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও আমলারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকের দেশীয় সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়।

ধারণা করা হচ্ছে, আইনি জটিলতা ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত হওয়ার ভয়ে তাদের অনেকেই তড়িঘড়ি করে বিভিন্ন উপায়ে অর্থ এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তর করেছেন। এছাড়া বিগত সরকারের আমলে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হওয়ার বিষয়টি সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্রেও বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছিল। সেই পাচারকৃত অর্থের একটি বড় অংশই বিভিন্ন হাত ঘুরে সুইস ব্যাংকে জমা হয়েছে বলে মনে করছেন আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা।

বদলে যাওয়া সুইস ব্যাংক এবং আধুনিক পাচার পদ্ধতি

একটা সময় ছিল যখন সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো ছিল কালো টাকা বা পাচার করা অর্থের সবচেয়ে নিরাপদ স্বর্গ। এর মূল কারণ ছিল তাদের কঠোর গোপনীয়তার আইন। সুইস ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের কোনো তথ্য অন্য কোনো দেশের সরকারের কাছে প্রকাশ করত না।

তবে আন্তর্জাতিক চাপ এবং মানি লন্ডারিং বিরোধী বিভিন্ন চুক্তির কারণে গত কয়েক বছরে এই নিয়মে বড় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে সুইজারল্যান্ড সরকার বিভিন্ন দেশের আইনি অনুরোধ বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে তথ্য আদান-প্রদান করছে। এই কড়াকড়ির কারণে পাচারকারীরা এখন সরাসরি অর্থ জমা রাখার চেয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে (যেমন ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিং) বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করছে এবং সেখান থেকে সুইস ব্যাংকিং সিস্টেমে অর্থ প্রবেশ করাচ্ছে।