ছবিঃ উত্তরপত্র

দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আগামী ১ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হতে যাচ্ছে সরকারের নবম পে-স্কেল বা নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো। তবে সব ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা, প্রজ্ঞাপন জারি এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগার কারণে বর্ধিত বেতনের অর্থ হাতে পেতে সরকারি চাকরিজীবীদের আগামী অক্টোবর মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামোতে মূল বেতন সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করা হলেও, বর্তমানে চালু থাকা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ‘বিশেষ সুবিধা’ বা ইনসেনটিভ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে কাগজে-কলমে বেতন বৃদ্ধির হার যতটা বড় দেখাচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের পকেটে আসা প্রকৃত বা নিট বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ তার চেয়ে কিছুটা কম হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের কৌশল এবং রূপরেখা নির্ধারণের লক্ষ্যে আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত সচিব কমিটির এই বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ এবং সচিব কমিটির নিজস্ব পর্যবেক্ষণগুলো পর্যালোচনা করা হবে। এর পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো সম্পর্কিত বিষয়গুলোও এই বৈঠকে গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হবে।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার পর থেকেই অর্থ বিভাগের একাধিক টিম দ্রুততার সাথে এর বাস্তবায়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন ক্যাডারের পাশাপাশি শিক্ষক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসন, বিচার বিভাগীয় কর্মচারী, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই নতুন পে-স্কেলের আওতাভুক্ত হবেন।
অর্থ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার পর বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। এখন মূল লক্ষ্য হলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে এর সুফল কর্মচারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তবে প্রজ্ঞাপন জারি, সরকারি বিধিমালা সংশোধন ও অন্যান্য ব্যাংকিং আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সাধারণত কয়েক মাস সময় লেগে যায়। সে কারণে জুলাই থেকে এটি কার্যকর ধরা হলেও, অক্টোবর মাসের আগে ব্যাংক হিসাবে বর্ধিত অর্থ পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম। তবে চাকরিজীবীরা জুলাই থেকে বকেয়া (Arrears) হিসেবে এই অর্থ পাবেন।
দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ এই প্রসঙ্গে বলেন, বর্তমান বাজারমূল্য ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় সরকারি কর্মচারীদের আয় বৃদ্ধি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। তবে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে দেশের আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির মধ্যে একটি কঠোর ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বেতন বৃদ্ধি যদি দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা এবং রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে তা অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে। তাই ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তটি বেশ বাস্তবসম্মত। একই সাথে তিনি গ্রেড বৈষম্য দূর করে নিচের দিকের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
বর্তমানে দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি বিশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সুবিধা চালু রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তারা ১০ শতাংশ হারে এই বিশেষ সুবিধা বা ইনসেনটিভ পেয়ে আসছিলেন।
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই এই বিশেষ সুবিধাটি আলাদাভাবে আর বহাল থাকবে না। বরং এটিকে নতুন বর্ধিত মূল বেতনের সাথে একীভূত বা সমন্বয় করা হবে। ফলশ্রুতিতে, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের প্রকৃত বা নিট বেতন বৃদ্ধি পাবে প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই কার্যকর বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে প্রায় ৪০ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সাময়িক কোনো ভাতা বা ইনসেনটিভের চেয়ে মূল বেতন (Basic Salary) শক্তিশালী করা দীর্ঘমেয়াদে কর্মচারীদের জন্য বেশি লাভজনক। কারণ মূল বেতন বাড়লে অবসরকালীন সুবিধা যেমন—পেনশন, গ্র্যাচুইটি এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ মোট ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।