বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে কয়েক মাসের মধ্যেই অগ্রগতির আশা বাণিজ্যমন্ত্রীর - Uttorpatro TV

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে কয়েক মাসের মধ্যেই অগ্রগতির আশা বাণিজ্যমন্ত্রীর

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 18, 2026

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আবারও স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হতে পারে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি বা সিআইআইয়ের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতার পরিসর আরও বড় করা সম্ভব। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের সুযোগকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তার মতে, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে হলে বিদ্যমান বাণিজ্যিক বাধাগুলো কমানো জরুরি। পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত সহজ করতে ভিসা প্রক্রিয়ায়ও সুবিধা তৈরি করা প্রয়োজন। বেসরকারি খাতকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

বৈঠকে সিআইআই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির ডিরেক্টর জেনারেল চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি। দুই দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোন খাতে যৌথভাবে কাজ করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা করেন প্রতিনিধিরা।

বাণিজ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, আয়তন, জনসংখ্যা কিংবা অর্থনীতির আকারে দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও ভৌগোলিক বাস্তবতা তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি সম্মিলিতভাবে বড় হলেও এ অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ তুলনামূলক কম। ফলে আন্তঃআঞ্চলিক অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো গেলে শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের ভিসা জটিলতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনে নিয়মিত যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের কয়েক মাস পরপর নতুন ভিসার আবেদন করা বাস্তবসম্মত নয়। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি ভিসা ব্যবস্থার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

বৈঠকে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে ভারতীয় সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাবও এসেছে। এ জন্য দুটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেয় সিআইআই। এর একটি অবকাঠামো উন্নয়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি প্রকল্পে সহযোগিতা বাড়াতে কাজ করবে। অন্য টাস্কফোর্সটি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় শিল্প খাত নিয়ে কাজ করবে।

উচ্চপ্রযুক্তির সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং ডাটা সেন্টারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে সিআইআই।

ভারতের অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে বলে বৈঠকে মত দেওয়া হয়। সিআইআইয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভারতে গত বছর অবকাঠামো খাতে প্রায় ২৫ লাখ কোটি রুপি বিনিয়োগ হয়েছে এবং এর বড় একটি অংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে দেশি ও বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও এ ধরনের অভিজ্ঞতা সহায়ক হতে পারে।

স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশে অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান উৎপাদনের সক্ষমতা রাখলেও নানা সমস্যার কারণে তাদের কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা গেলে স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে এবং বিভিন্ন পণ্যের আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

বৈঠকে স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানিতে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়টিও উঠে আসে। এনার্জিপ্যাকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরে একজন প্রতিনিধি বলেন, দেশে উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও কিছু পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। স্থলবন্দর ব্যবহার করে এসব পণ্য আনতে অনেক ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। স্থানীয় শিল্পকে আরও শক্তিশালী করা গেলে এই ধরনের নির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে মত দেওয়া হয়।

ভোগ্যপণ্য বা এফএমসিজি খাতেও বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিআইআই। ঢাকার আশপাশে সাবান, হোম কেয়ার ইনসেক্টিসাইড, ফ্র্যাগরেন্সসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের জন্য একটি আধুনিক সমন্বিত কারখানা স্থাপনের আগ্রহের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে অনিবন্ধিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রতিনিধিরা।

শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সিআইআই প্রতিনিধিরা জানান, তাদের স্টিম-ভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক ও খাদ্যশিল্পে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। তাদের হিসাবে, কিছু ক্ষেত্রে গ্যাস ব্যবহারে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে। তবে শুল্ক কাঠামোর পার্থক্যের কারণে এসব প্রযুক্তি বাংলাদেশে ব্যবহারে বাধা তৈরি হচ্ছে বলে তারা জানান।

শুধু বিনিয়োগ ও বাণিজ্য নয়, দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ নিয়েও সহযোগিতার প্রস্তাব এসেছে। বাংলাদেশের তরুণদের ভারতীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের তৃতীয় দেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ভিসা জটিলতা কমাতে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেছে সিআইআই।

সব মিলিয়ে বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ককে শুধু আনুষ্ঠানিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, ব্যবসায়ী পর্যায়ের অংশগ্রহণ এবং যৌথ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইতিবাচক অগ্রগতির আশাবাদ বাস্তবে কতটা রূপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগসংশ্লিষ্টদের।