পুলিশের তাক করা অস্ত্রের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ ছবি: মঈনুল ইসলাম, ১৬ জুলাই ২০২৪

বিশেষ প্রতিবেদন, ঢাকা: ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত থাকে যা কোনো দীর্ঘ ভাষণ বা ইশতেহারের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস চত্বরে ঠিক তেমনই এক ইতিহাসের জন্ম হয়েছিল। পুলিশ ও সশস্ত্র রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দিয়েছিলেন তরুণ শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। একের পর এক গুলি এসে বিদ্ধ করেছিল তাঁর বুক, তারপর নির্মম মৃত্যু। কিন্তু সেই মুহূর্তের ক্যামেরা বন্দী ছবিটি আর কেবল একজন তরুণের ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের গল্প হয়ে থাকেনি; তা রূপান্তরিত হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিরোধ, অসীম সাহস, স্বৈরাচার বিরোধী চেতনা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীকে।
আজ দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এখন এক জটিল ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। একদিকে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতনের পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক চর্চাকে নতুন করে সাজানোর কঠিন লড়াই, অন্যদিকে নাগরিক আকাঙ্ক্ষা ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের তীব্র আশঙ্কা—সব মিলিয়ে এক মিশ্র দোলাচলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পুরো দেশ। এই সমস্ত রাজনৈতিক ওঠানামা ও বিতর্কের মধ্যেও আবু সাঈদের ছবিটি বারবার ঘুরেফিরে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ, কিছু ঐতিহাসিক ছবি শুধু অতীতকে মনে করিয়ে দেয় না, তা বর্তমানের শাসকদের দিকেও ভবিষ্যৎ নিয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও ছবির ভাষা আমরা সচরাচর রাজনীতিকে জাতীয় সংসদ, নির্বাচন বা ক্ষমতার অলিন্দে সীমাবদ্ধ দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি দেখিয়েছেন, ক্ষমতা কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে টিকে থাকে না; তা মানুষের সম্মতি ও কল্পনাকেও গ্রাস করতে চায়। রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠী সবসময় চায় কোন ঘটনাটিকে ‘শৃঙ্খলা রক্ষা’ বলা হবে আর কোনটিকে ‘দমন-পীড়ন’—তা নিজেদের মতো করে সংজ্ঞায়িত করতে। একেই বলে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের লড়াই। আবু সাঈদের সেই ছবি রাষ্ট্রের তৈরি করা এই ন্যারেটিভে একটি বড়সড় ফাটল ধরিয়েছিল। ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক স্টুয়ার্ট হলের মতে, ছবি কেবল বাস্তবতার প্রতিফলন নয়, তা নতুন বাস্তবতার অর্থ নির্মাণ করে। নিরস্ত্র এক তরুণের বুক টানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে বাধ্য করেছে।
ফরাসি দার্শনিক জাক রঁসিয়ের তত্ত্ব অনুযায়ী, ‘কার কণ্ঠ শোনা যাবে এবং কোন যন্ত্রণা রাজনৈতিক স্বীকৃতি পাবে’—তা ক্ষমতার একটি বড় প্রশ্ন। আবু সাঈদের দেহভঙ্গি কোনো আত্মসমর্পণের ভঙ্গি ছিল না, আবার তা প্রথাগত আক্রমণেরও ছিল না। এটি ছিল এক ধরণের নৈতিক অবাধ্যতা (Moral Defiance), যা জুডিথ বাটলারের ভাষায় মানুষের দেহকে একটি রাজনৈতিক ভাষায় রূপান্তর করে। নূর হোসেনের খোলা বুক কিংবা তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ট্যাংকের সামনে দাঁড়ানো তরুণের মতোই আবু সাঈদের ছবি যুগের নৈতিক সংকটকে দৃশ্যমান করেছে।
সংস্কারের সংকট ও নতুন উদ্বেগের রাজনীতি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামনে রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠন, সাংবিধানিক সংস্কার এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার একটি ঐতিহাসিক ও বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থান নিজে থেকে গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা দেয় না। পুরোনো শাসনব্যবস্থার পতন ঘটলেও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভূত প্রায়শই নতুন ব্যবস্থায় ভর করে।

গুলির সামনে বুক টান করে দাঁড়ানো রংপুরের সেই আবু সাঈদ। রংপুর পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি ছবি: মঈনুল ইসলাম
আজকের বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে, মৌলিক সংস্কারের এজেন্ডাগুলো ধীরে ধীরে গতি হারাচ্ছে। কখনো সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার আইনি মারপ্যাঁচে, কখনো বাস্তব রাজনীতির ক্ষমতাকেন্দ্রীক যুক্তিতে, আবার কখনো দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থে সংস্কারের মূল লক্ষ্যগুলো পেছনে পড়ে যাচ্ছে। যদি সংবিধানকে গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঠেকানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে তা গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনার সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করার শামিল।
এরই সমান্তরালে আরেকটি বড় উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্বৈরাচার পতনের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজে উগ্র ডানপন্থা ও অসহিষ্ণু রাজনীতির নানা রূপ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো যখন সংস্কারের প্রশ্নে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে, চরমপন্থী শক্তিগুলো তখন খুব সহজ ও আবেগঘন উত্তর নিয়ে সাধারণ মানুষের সামনে হাজির হয়। তারা সামাজিক বৈচিত্র্যের বদলে একরূপতা চাপিয়ে দিতে চায়, নাগরিক অধিকারের বদলে সংকীর্ণ পরিচয়ের রাজনীতি করতে ভালোবাসে এবং যুক্তির চেয়ে আবেগকে বেশি প্রাধান্য দেয়।
প্রতীকের মালিকানা বনাম সাহসী নাগরিকের শক্তি জার্মান চিন্তাবিদ ওয়াল্টার বেঞ্জামিন লিখেছিলেন, আধুনিক রাজনীতিতে ক্ষমতা নিজেকে দৃশ্যমান করে তোলে বিভিন্ন প্রতীক ও আচারের মাধ্যমে। কিন্তু প্রতিরোধও তার নিজস্ব দৃশ্যমানতা খুঁজে নেয়। আবু সাঈদের ছবিটি ছিল প্রতিরোধের সেই অনন্য নন্দনতত্ত্ব। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এই জাতীয় প্রতীককে নিজেদের দলীয় সম্পদে পরিণত করার এক অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। কে এই শহীদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী—তা নিয়ে চলছে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি।
আমাদের মনে রাখা দরকার, আবু সাঈদের ছবিটি যদি কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পদে পরিণত হয়, তবে এর বৈশ্বিক নৈতিক শক্তি নষ্ট হয়ে যাবে। তাঁর সেই উন্মুক্ত দুই হাত কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ের গণ্ডিতে বন্দি ছিল না; তা ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একজন স্বাধীন ও মুক্ত নাগরিকের অসম সাহসের প্রতীক। আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে এই ছবিটিকে একটি ‘পলিটিক্যাল টেক্সট’ হিসেবে নতুন করে পাঠ করা জরুরি। এই ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি কোনো একক নেতা বা দল নয়; বরং রাষ্ট্রের মূল শক্তি হলো প্রশ্ন করতে জানা সাহসী ও সচেতন নাগরিক।