কার্লো আনচেলত্তির ভুলেই কি বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ব্রাজিল? মেলো ও রোমারিওর কড়া সমালোচনা - Uttorpatro TV বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়: আনচেলত্তির কৌশল নিয়ে তোপ দাগলেন মেলো ও রোমারিও

কার্লো আনচেলত্তির ভুলেই কি বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ব্রাজিল? মেলো ও রোমারিওর কড়া সমালোচনা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: July 6, 2026

বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও ট্র্যাজেডির শিকার পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। নকআউট পর্বের শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলের ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে সেলেকাওরা। মাঠের এই ব্যর্থতার পর ব্রাজিলের ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা ও কাঁদা ছোড়াছুড়ি। দলের এই ভরাডুবির পেছনে ফুটবলারদের চেয়েও কোচ কার্লো আনচেলত্তির ভুল কৌশল এবং সিবিএফের (CBF) দূরদর্শিতার অভাবকে দায়ী করছেন দেশটির সাবেক তারকা ফুটবলাররা। বিশেষ করে ফেলিপে মেলো এবং কিংবদন্তি রোমারিও ইতালিয়ান এই কোচের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।

কাঠগড়ায় আনচেলত্তি, নেইমারকে শুরুতে না নামানোর খেসারত ব্রাজিলের সাবেক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফেলিপে মেলো তাঁর দেশের জনপ্রিয় ‘সেলেকাও স্পোরটিভি’ অনুষ্ঠানে বিশ্বকাপের ধারাভাষ্যকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের পর তিনি সরাসরি দলের ইতালিয়ান হেড কোচ কার্লো আনচেলত্তির দিকে আঙুল তুলেছেন। মেলোর মতে, ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই কোচের ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই ব্রাজিলকে টুর্নামেন্ট থেকে অসময়ে বিদায় নিতে হলো।

মেলো তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “যেকোনো হারের পর কোচের ঘাড়ে দোষ চাপানো খুব সহজ কাজ। কিন্তু এই ম্যাচের ক্ষেত্রে কোচকেই প্রধান অপরাধী হিসেবে দাঁড় করাতে হবে। আমরা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা একজন কোচকে দলের দায়িত্বে এনেছি, তাই ব্যর্থতার প্রথম দায়টাও তাঁরই।”

দলের প্রধান তারকা নেইমারকে প্রথমার্ধ থেকে মাঠে না নামানোকে আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে দেখছেন ২০১০ বিশ্বকাপে খেলা মেলো। চোটের কারণে লুকাস পাকেতা দলে না থাকায় তাঁর জায়গায় গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে শুরুর একাদশে সুযোগ দিয়েছিলেন আনচেলত্তি। কিন্তু মেলো মনে করেন, এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শুরু থেকেই নেইমারকে খেলানো উচিত ছিল। ম্যাচের ১৪ মিনিটে ব্রাজিল একটি পেনাল্টি পেলেও ব্রুনো গিমারাইস তা গোল করতে ব্যর্থ হন। মেলোর দাবি, নেইমার মাঠে থাকলে তিনিই পেনাল্টি নিতেন এবং ম্যাচের ভাগ্য বদলে যেত।

পরবর্তীতে ম্যাচের ৬৭ মিনিটে মার্তিনেল্লির বদলি হিসেবে নেইমারকে মাঠে নামান আনচেলত্তি। একদম শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের একমাত্র সান্ত্বনাসূচক গোলটি করেন এই আল-হিলাল তারকা। ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, দলে পেনাল্টি নেওয়ার ক্ষেত্রে নেইমারই সবচেয়ে দক্ষ। যা মেলোর অভিযোগের ধার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সিবিএফের চুক্তি নবায়ন ও ২০৩০ সালের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন বিপর্যয়ের পর সমালোচনা কেবল মাঠের কৌশলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা গড়িয়েছে সিবিএফের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত পর্যন্ত। গত বছরের মে মাসে ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়া আনচেলত্তির চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের মে মাসে আরও চার বছরের জন্য বৃদ্ধি করা হয়। এই সিদ্ধান্তের পর ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবলে গুঞ্জন ওঠে যে, ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য দল পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকায় সিবিএফ মূলত ২০৩০ বিশ্বকাপকে পাখির চোখ করে এগোচ্ছে। নরওয়ের কাছে হারের পর আনচেলত্তির মন্তব্যও সেই গুঞ্জনকে উসকে দেয়, যেখানে তিনি বলেছিলেন—‘এই হার হলো নতুন এক অভিযানের শুরু।’

তবে সিবিএফের এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেছেন ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোমারিও। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘ও গ্লোবো’তে লেখা নিজের কলামে রোমারিও ফুটবল ফেডারেশনের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি লিখেন, “আমি হলে বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টের আগে কখনোই আনচেলত্তির চুক্তি নবায়ন করতাম না। ফুটবলে পারফরম্যান্সের চেয়েও ফলাফলের গুরুত্ব বেশি। একজন কোচের কাজের মূল্যায়ন সবসময় টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর করা উচিত।”

রোমারিওর চোখে মাঠের কৌশলগত ভুল খেলোয়াড় পরিবর্তন এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পেছনেও আনচেলত্তির ফুটবলীয় দর্শনের সমালোচনা করেছেন রোমারিও। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে ব্রুনো গিমারাইসকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। রোমারিও তাঁর কলামে উল্লেখ করেন, “দ্বিতীয়ার্ধে ব্রুনোর বদলি নামানোর পর এমনিতেই ছন্নছাড়া থাকা ব্রাজিল দলের খেলার ধার পুরোপুরি কমে যায়। মিডফিল্ডের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নরওয়ে পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় এবং তাদের তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড অবাধে আক্রমণ করার সুযোগ পেয়ে যান।”

বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে ব্রাজিলের এই বিদায় কেবল একটি ম্যাচ হারাই নয়, বরং দলটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং কার্লো আনচেলত্তির কোচিং দর্শনকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। হেক্সা মিশনের স্বপ্ন আরও একবার ভেঙে যাওয়ায় এখন আমূল পরিবর্তনের দাবি উঠছে সেলেকাও শিবিরে।