খুলনায় মসজিদে ঢুকে মুসল্লিদের ওপর গুলি, তদন্তে পুলিশ - Uttorpatro TV খুলনায় মসজিদে ঢুকে মুসল্লিদের ওপর গুলি, তদন্তে পুলিশ | KMP News

খুলনায় মসজিদে ঢুকে মুসল্লিদের ওপর গুলি, তদন্তে পুলিশ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 14, 2026
খুলনার দৌলতপুরে রোববার ভোরে মসজিদে নামাজ চলাকালে দুই মুসল্লিকে গুলির ঘটনা ঘটেছে ছবি : সংগৃহীত

খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর থানা এলাকায় পবিত্র মসজিদের অভ্যন্তরে ঢুকে ফজরের নামাজ শেষে দুই মুসল্লিকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। রোববার (১৪ জুন, ২০২৬) ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে পশ্চিম কাশীপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র জামে মসজিদে এই নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে। এই নজিরবিহীন হামলায় মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি ও ব্যবসায়ীসহ দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন। ঘটনার পর থেকে এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে একাধিক দিক সামনে রেখে মাঠে নেমেছে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো রোববার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে দৌলতপুরের পশ্চিম কাশীপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র জামে মসজিদে ফজরের নামাজ শেষ হয়। নামাজ শেষে মসজিদের ভেতরে বসে কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন মসজিদ কমিটির দীর্ঘকালীন সেক্রেটারি লোকমান হাকিম (৪৫)। একই সময়ে মসজিদের বারান্দায় বসে জিকির করছিলেন স্থানীয় কাপড়ের ব্যবসায়ী আলম শেখ (৫৫)।

ঠিক এই সময়ে আকস্মিকভাবে কয়েকজন সশস্ত্র দুর্বৃত্ত মসজিদে প্রবেশ করে। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকমান হাকিমকে লক্ষ্য করে পর পর বেশ কয়েকটি গুলি ছোড়ে। এ সময় পাশেই থাকা আলম শেখও গুলিবিদ্ধ হন। গুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং রক্তাক্ত অবস্থায় দুজনেই মসজিদের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। কাজ হাসিল করে দুর্বৃত্তরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেই লোকমান হাকিম কোনোমতে মুঠোফোনে তাঁর স্বজনদের বিষয়টি জানান।

রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, লোকমান হাকিমের শরীরে একাধিক গুলি লাগায় তাঁর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। খুলনায় প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে রাজধানী ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, গুলিবিদ্ধ অন্য মুসল্লি ব্যবসায়ী আলম শেখ বর্তমানে খুলনাতেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পবিত্র উপাসনালয়ে এমন রোমহর্ষক হামলার পর নড়েচড়ে বসেছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। রোববার বিকেল পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের না হলেও এবং কাউকে আটক করা সম্ভব না হলেও পুলিশ বলছে, তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত তাদের হাতে এসেছে।

পুলিশের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • চরমপন্থী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা: গুলিবিদ্ধ লোকমান হাকিমের সাথে কোনো নিষিদ্ধ বা চরমপন্থী গোষ্ঠীর পূর্ব কোনো যোগাযোগ বা বিরোধ ছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

  • চোরাই তেল কারবার: ওই এলাকায় তেল কারবার সংক্রান্ত কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা আর্থিক লেনদেনের বিরোধ ছিল কি না, তা-ও তদন্তের টেবিলে রয়েছে।

  • ব্যবসায়িক ও পারিবারিক বৈরিতা: লোকমান হাকিম ওজোপাডিকোর (WZPDCL) একজন তালিকাভুক্ত ঠিকাদার এবং একটি তেলের ডিপোর কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর এই বড় অঙ্কের ব্যবসায়িক লেনদেন কিংবা কোনো পারিবারিক শত্রুতা এই হামলার কারণ কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।

তদন্তের স্বার্থে পুলিশ ইতিমধ্যেই আশেপাশের সমস্ত সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ ও ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। প্রথম আলোর হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ঘটনার ঠিক কিছুক্ষণ আগে অর্থাৎ ভোর ৫টা ২৭ মিনিটের দিকে মসজিদের সামনে দিয়ে একটি লাল রঙের মোটরসাইকেলে দুই ব্যক্তি দ্রুত চলে যায়। এছাড়া অন্য একটি ফুটেজে আরও একজনকে সন্দেহজনকভাবে ওই এলাকা রেকি (Reece) করতে দেখা গেছে। পুলিশ বর্তমানে এই সন্দেহভাজনদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এই বিষয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “গুলির ঘটনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্তাধীন রয়েছে। এই মুহূর্তে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে ঘটনাস্থল থেকে চারটি গুলির খোসা ও একটি অব্যবহৃত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।”

অন্যদিকে কেএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) সুদর্শন কুমার রায় জানান, ঘটনার তদন্তে পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম কাজ করছে। তিনি বলেন, “ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। ভুক্তভোগী মূলত একজন ব্যবসায়ী, তাঁর রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বিরোধ ছিল কি না তা আমরা খতিয়ে দেখছি।”

পশ্চিম কাশীপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র জামে মসজিদের ইমাম আমানত উল্লাহ অত্যন্ত মর্মাহত কণ্ঠে জানান, তিনি দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে এই মসজিদে খেদমত করছেন। এই দীর্ঘ সময়ে লোকমান হাকিমকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করতে দেখেছেন। তিনি একজন পরোপকারী মানুষ হিসেবেই এলাকায় পরিচিত। ইমাম বলেন, “নামাজ শেষে লোকমান আমার সাথে কিছুক্ষণ কোরআন পড়েন, এরপর আমি চলে যাই। আধ ঘণ্টা পরেই এই দুঃসংবাদ পাই। মসজিদের ভেতর এমন ঘটনা ঘটবে তা ভাবাই যায় না।”

এলাকার নিয়মিত মুসল্লিরা এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছেন। তারা অবিলম্বে এই কাপুরুষোচিত হামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।