দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ঢাকার অভিজাত ‘বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা’ সম্পূর্ণভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আসছে। গত ৭ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয় এবং পরবর্তী সময়ে ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ-সংক্রান্ত নথিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। এর ফলে এলাকাটিতে দীর্ঘ চার দশক ধরে চলে আসা বসুন্ধরা গ্রুপের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং সমান্তরাল শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
প্রায় ৩ হাজার ৪০৪ একর আয়তনের বিশাল এই আবাসিক এলাকাটি এত দিন মূলত বসুন্ধরা গ্রুপ এবং তাদের অনুগত ‘বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’র নিজস্ব নিয়মে পরিচালিত হয়ে আসছিল। সাধারণ বাসিন্দা ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এলাকাটি যেন ছিল ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র’। নিজস্ব নিরাপত্তাবাহিনী, নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং নিজস্ব নিয়মনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ থাকায় এত দিন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এখান থেকে কোনো গৃহকর (হোল্ডিং ট্যাক্স) আদায় করতে পারত না। এমনকি রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, খেলার মাঠ বা অন্যান্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও ছিল সম্পূর্ণ বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এই গাড়ি চলাচল করে
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ব্যক্তিমালিকানার কোনো জমি কেনাবেচা করতে গেলে সরকারি করের বাইরেও কাঠাপ্রতি মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হতো বসুন্ধরা গ্রুপকে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে এই ফির পরিমাণ কাঠাপ্রতি ১০ লাখ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মালিকদের কাছ থেকে ২ থেকে দেড় লাখ টাকা অতিরিক্ত ফি নেওয়া হতো। ফ্ল্যাটমালিকদের কাছ থেকে বর্গফুট মেপে প্রতি মাসে জোরপূর্বক আদায় করা হতো মোটা অঙ্কের ‘সার্ভিস চার্জ’। সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে এলে বাসিন্দাদের এই অন্যায্য খরচের হাত থেকে মুক্তি মিলবে এবং তারা সরাসরি সরকারকে নির্ধারিত গৃহকর দিয়ে রাষ্ট্রীয় সব নাগরিক সেবা পাবেন।
২০১৬ সালেই এই এলাকাটিকে সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এর কোনো কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পর এই বিষয়ে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। গত মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। তারই ধারাবাহিকতায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সমন্বয়ে এই আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য প্রকাশের পর থেকেই বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বর্তমানে তাদের দেশত্যাগে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, বেসরকারি আবাসন প্রকল্পগুলোর সর্বোচ্চ ১০ বছরের মধ্যে উন্নয়নকাজ শেষ করে মাঠ, থানাসহ নাগরিক সেবার জমি সরকারি সংস্থার কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। ১৯৮৭ সালে যাত্রা শুরু করা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা বারবার লে-আউট প্ল্যান সংশোধন করে দীর্ঘ ৩৯ বছর ধরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম স্পষ্ট জানিয়েছেন, বসুন্ধরাকে দ্রুত এই এলাকা সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করার জন্য ইতিমধ্যে দুবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, তারা সরকারের নির্দেশনা পেয়েছেন এবং খুব দ্রুতই বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করে এলাকাটিতে আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কাজ শুরু করবেন। এলাকাটিতে নতুন পুলিশ থানা স্থাপনসহ সব নাগরিক সুবিধা সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।