রংপুরে আশানুরের এক অভিনব ও সফল উদ্যোগ: গরুর ‘আবাসিক হোটেল - Uttorpatro TV ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা কমাল আশানুরের ‘গরুর হোটেল’, কোরবানির ঈদে উপচে পড়া ভিড়

রংপুরে আশানুরের এক অভিনব ও সফল উদ্যোগ: গরুর ‘আবাসিক হোটেল

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ১৯, ২০২৬
গরু ব্যবসায়ীদের কাছে আশানুরের গরুর আবাসিক হোটেল আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে ছবি:উত্তরপত্র

রংপুর নগরের মডার্ন মোড় পার হয়ে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পাশেই বারো আউলিয়া এলাকা। প্রথম দেখায় দূর থেকে এটিকে সাধারণ কোনো গরুর খামার মনে হতে পারে। কিন্তু একটু ভেতরে পা রাখলেই চেনা চবির বাইরে এক অন্যরকম কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ে। এটি কোনো সাধারণ খামার নয়, বরং এটি হলো দেশের বুকে এক ব্যতিক্রমী ‘গরুর আবাসিক হোটেল’। যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে আসা গরু ব্যবসায়ীদের কেনা পশুরা পায় চমৎকার আপ্যায়ন, নিরাপত্তা আর আরামদায়ক বিশ্রামের সুযোগ।

আজ থেকে প্রায় এক দশক আগের কথা। আশানুর ইসলাম (৪৫) তখন বাবা আনছার আলীর সঙ্গে বিভিন্ন হাটে যেতেন গরু কিনতে। হাটে গিয়ে তিনি একটি বড় সমস্যার মুখোমুখি হতেন। দূর থেকে আসা ব্যবসায়ীরা গরু কেনার পর সেগুলো রাখার মতো নিরাপদ কোনো জায়গা পেতেন না। খোলা আকাশের নিচে রোদ, ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে অবলা প্রাণীগুলো প্রচণ্ড কষ্ট পেত। অনেক সময় দীর্ঘ ক্লান্তি আর বৈরী আবহাওয়ার কারণে হঠাৎ করে গরু মারাও যেত। এতে মুহূর্তের মধ্যে খামারি ও ব্যবসায়ীরা বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তেন।

বাবার সঙ্গে এই কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন আশানুর। তিনি চিন্তা করেন, মানুষের জন্য যদি আবাসিক হোটেল থাকতে পারে, তবে অবলা প্রাণীদের সুরক্ষায় কেন এমন কিছু করা যাবে না? যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। বাবার পরামর্শ ও সহায়তায় ১০ বছর আগে তারা শুরু করেন এই অভিনব ‘গরুর আবাসিক হোটেল’। সময়ের ব্যবধানে আজ এই হোটেল দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গরু ব্যবসায়ীদের কাছে এক আস্থার ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ডান পাশে প্রায় ৫০ শতক জায়গা ভাড়া নিয়ে এই হোটেলটি পরিচালনা করছেন আশানুর। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল এই জায়গাজুড়ে দেওয়া হয়েছে মজবুত টিনের শেড। ভেতরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে শত শত গরু। শেডের ভেতরের পরিবেশ যেন বেশ আরামদায়ক হয়, সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় সূর্যের আলো প্রবেশের পথ রাখা হয়েছে। গরুর শরীর ঠান্ডা রাখতে মাথার ওপর অবিরাম ঘুরছে বৈদ্যুতিক পাখা।

হোটেলের সার্বিক পরিচ্ছন্নতার দিকেও রয়েছে কড়া নজর। একদল দক্ষ শ্রমিক সার্বক্ষণিক গোবর পরিষ্কার এবং মেঝে ধোয়ামোছার কাজে ব্যস্ত থাকেন। একই সঙ্গে গরুর পুষ্টির কথা মাথায় রেখে এখানে খড়, কুঁড়ো এবং ভুসির আলাদা সুব্যবস্থা রয়েছে।

কুরবানির ঈদ উপলক্ষে আশানুর ইসলামের গরুর আবাসিক হোটেলে এখন গরু দিয়ে ভরপুর। রংপুরের বারো আউলিয়া এলাকায়ছবি: মঈনুল ইসলাম

সাধারণ সময়ে এই আবাসিক হোটেলে গরুপ্রতি মাত্র ৫০ টাকা নাইট চার্জ বা ভাড়া নেওয়া হয়। তবে সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদ থাকায় বর্তমানে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারদের আগমন বহুগুণ বেড়েছে। বাড়তি চাপ সামাল দিতে এবং সেবার মান ধরে রাখতে বর্তমানে গরুপ্রতি ভাড়া মাত্র ১০ টাকা বাড়িয়ে ৬০ টাকা করা হয়েছে।

রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামসহ আশেপাশের জেলাগুলোর শঠিবাড়ি, লালবাগ, বেদগাড়ি, বুড়িরহাট ও পাওটানার মতো বড় বড় হাট থেকে প্রতিদিন শত শত গরু কিনছেন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের ব্যবসায়ীরা। অনেক সময় হাট শেষে তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাক বা পরিবহনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। তখনই ব্যবসায়ীদের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে আশানুরের এই হোটেল।

চট্টগ্রাম থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী সুরুজ মিয়া জানান, আগে রংপুর অঞ্চলে এসে গরু কেনার পর সেগুলো নিয়ে যাতায়াত ও রাখার জায়গা নিয়ে তাদের ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো। অনেক সময় হাটের ধকল ও সঠিক বিশ্রামের অভাবে গরু অসুস্থ হয়ে যেত। এখন এই আবাসিক হোটেলের কল্যাণে তারা সুবিধাজনক সময়ে নিশ্চিন্তে গরু ট্রাকে লোড করতে পারছেন।

আরেক ব্যবসায়ী এমদাদ হোসেন এই হোটেলের আন্তরিকতার প্রশংসা করে বলেন, “এখানে শুধু ব্যবসাই হয় না, তৈরি হয়েছে এক গভীর সৌহার্দ্য। কোনো ব্যবসায়ীর হঠাৎ টাকার সংকট হলে আশানুর ভাই বা তার পরিবার তাৎক্ষণিকভাবে ধার দিয়েও সাহায্য করেন।”

আশানুরের এই ব্যবসায়িক উদ্যোগে তার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন ছোট ভাই শাহিন মিয়া এবং ভগ্নিপতি আলাল মিয়া। শাহিন মিয়া জানান, “ব্যবসায়ীরা মূলত আমাদের ওপর তাদের পশুর নিরাপত্তার দায়িত্বটা ছেড়ে দেন। গত ১০ বছরে আমাদের এখান থেকে একটি গরুও হারায়নি বা কোনো প্রকার দুর্ঘটনা ঘটেনি। এই সততা ও নিরাপত্তাই আমাদের মূল পুঁজি।”

ব্যতিক্রমী ও পশুবান্ধব এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা এই বিষয়ে বলেন, “এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় এবং আধুনিক উদ্যোগ। দূরদেশ থেকে আসা ব্যবসায়ীরা হাটের গরু কিনে এখানে নিরাপদে রাখতে পারছেন। এর ফলে যাতায়াতের আগে পশুরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ক্লান্তি ও অসুস্থতার ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দিচ্ছে। এই ধরণের উদ্যোগ দেশের পশুপালন ও বিপণন খাতকে আরও সমৃদ্ধ করবে।”

এক যুগান্তকারী চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে আশানুর ইসলাম আজ সফল। তার এই গরুর আবাসিক হোটেল কেবল একটি ব্যবসাই নয়, বরং পশু কল্যাণ ও দেশের গবাদিপশু ব্যবসার প্রসারে এক অনন্য মাইলফলক।