শঙ্কা আছে নেইমারকে নিয়েও এএফপি

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই ব্রাজিলের সাধারণ মানুষের কাছে এক অন্য রকম আবেগের নাম। এই মহারণ শুরু হলে লাতিন আমেরিকার এই ফুটবল পাগল দেশটির চিরচেনা ব্যস্ততা যেন মুহূর্তের মধ্যে থমকে যায়। সেলেসাওদের কাছে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটার চেয়ে বড় এবং মর্যাদার আর খুব কম কিছুই আছে। আর যারা এই বিশ্বমঞ্চে হলুদ জার্সি গায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান, তাঁদের জন্য এটি পরম স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো এক মুহূর্ত।
তবে ফুটবলের এই পরম আরাধ্য স্বপ্ন সবার ভাগ্যে সমানভাবে ধরা দেয় না। অনেক তারকা ফুটবলার কঠোর পরিশ্রম করে দলে জায়গা করে নিলেও, ঠিক টুর্নামেন্টের আগমুহূর্তে অনাকাঙ্ক্ষিত চোটের ধাক্কায় ছিটকে যান। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপেও ঠিক এমন এক ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফুটবলবিশ্ব। আর এই চোটের করাল গ্রাসে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল।

বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছেন রদ্রিগো এএফপি
বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করার মিশনে নামার আগেই ব্রাজিল দলের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলোয়াড়দের ফিটনেস সমস্যা। এরই মধ্যে সেলেসাওদের একাধিক প্রথম সারির এবং গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার চোটের কারণে দল থেকে পুরোপুরি ছিটকে গেছেন। আবার কেউ কেউ স্কোয়াডে থাকার লড়াইয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের আসরে মাঠের প্রতিপক্ষের চেয়েও ব্রাজিলের বড় পরীক্ষা দিতে হবে নিজেদের সাইডবেঞ্চের গভীরতা নিয়ে।
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্নযাত্রায় ধাক্কা দেওয়া চোটের তালিকায় অন্তত তিনটি বড় নাম রয়েছে, যা যেকোনো কোচের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। রিয়াল মাদ্রিদের নিয়মিত রক্ষণভাগের প্রধান ভরসা এদের মিলিতাও এবং আক্রমণভাগের ধারালো অস্ত্র রদ্রিগো— দুজনেই চোটের কারণে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছেন। রিয়াল মাদ্রিদ তথা ব্রাজিল দলের বর্তমান ডাগআউট সামলানো প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তির অন্যতম বিশ্বস্ত সৈনিক ছিলেন এই দুই তারকা। নিজ নিজ পজিশনে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা এই দুই ফুটবলারকে না পাওয়া ব্রাজিলের জন্য বিশাল এক শূন্যতা তৈরি করল।
তবে এবারের চোটের তালিকায় সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটির নাম চেলসির তরুণ উইঙ্গার এস্তেভাও। ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত এবং উদীয়মান খুদে জাদুকর হিসেবে ভাবা হচ্ছিল এই তরুণকে। ব্রাজিল দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কোচ আনচেলত্তি এই তরুণকে বিশ্বকাপের মূল অস্ত্র হিসেবে বিশেষভাবে গড়ে তুলেছিলেন।
কোচ আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের জার্সিতে মাত্র ৭ ম্যাচ খেলে ৫টি দর্শনীয় গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে আরও ৫টি গোল করিয়েছেন এস্তেভাও। ইতালিয়ান এই মাস্টারমাইন্ড কোচের অধীনে ব্রাজিলের কোনো ফুটবলারের এটাই সর্বোচ্চ গোল ও অ্যাসিস্টের রেকর্ড। তাঁর পায়ের জাদুতে ফুটবলপ্রেমীরা খুঁজে পাচ্ছিলেন সাম্বার সেই চিরাচরিত শৈল্পিক সৌন্দর্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, হ্যামস্ট্রিংয়ের গুরুতর চোটের কারণে শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের প্রাথমিক স্কোয়াডেই জায়গা পাননি এই তরুণ উইঙ্গার।
এস্তেভাও ও রদ্রিগোকে হারিয়ে যেখানে আক্রমণভাগ নিয়ে চিন্তিত কোচ, সেখানে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় পোস্টার বয় নেইমার জুনিয়রকে নিয়েও কাটেনি শঙ্কা। দীর্ঘদিনের ফিটনেস সমস্যায় থাকা এই তারকা যদি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত স্কোয়াডে জায়গাও পান, তবুও তাঁর চোটপ্রবণ ইতিহাস আনচেলত্তিকে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় রাখবে। এর আগে ২০১৪ সালের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে কোয়র্টার ফাইনালে চোটে পড়ে ছিটকে যাওয়ার পর ব্রাজিলের কী করুণ দশা হয়েছিল, তা ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকার কথা।
বিশ্বকাপের আগে চোটের এই জোড়া ধাক্কা বড় দলগুলোর মধ্যে একমাত্র ব্রাজিলকেই সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা করেছে। ব্রাজিলের পর যদি কোনো দলের নাম নিতে হয়, তবে সেটি স্পেন। স্প্যানিশ শিবিরের দুই ইনফর্ম উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামস ও লামিনে ইয়ামাল বিশ্বকাপের ঠিক আগে চোট পেয়েছেন। তবে স্প্যানিশ ভক্তদের জন্য আশার কথা হলো, দুজনেই হয়তো টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ফিট হয়ে দলে ফিরবেন। অবশ্য এফসি পোর্তোর ২২ বছর বয়সী প্রতিভাবান ফরোয়ার্ড সামু ওমোরোদিয়নের সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
অন্যদিকে ফ্রান্স, জার্মানি বা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার শিবিরেও চোট হানা দিয়েছে, তবে স্কোয়াডের গভীরতা বেশি থাকায় তাদের ক্ষতি তুলনামূলক কম। ফ্রান্স দল তাদের তরুণ তুর্কি হুগো একিতিকেকে হারিয়েছে এবং জার্মানিকে খেলতে হবে সার্জ নাবরিকে ছাড়াই। এগুলো বড় ক্ষতি হলেও ফ্রান্স ও জার্মানির বিকল্প খেলোয়াড়ের তালিকা বেশ দীর্ঘ।
আর্জেন্টিনার স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েছেন ফ্রাঙ্কো পানিচেল্লি ও ডিফেন্ডার হুয়ান ফয়েথ। বিশেষ করে ফয়থের জন্য এটি চরম হতাশার, কারণ চোটের কারণে তিনি ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও অংশ নিতে পারেননি। তবে আলবিসেলেস্তেদের বর্তমান যে ভারসাম্যপূর্ণ দল, তাতে এই দুজনের অনুপস্থিতি সামগ্রিক পারফরম্যান্সে খুব একটা বড় প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, অন্যান্য দলের তুলনায় ব্রাজিলের চোটের আঘাতটা সরাসরি দলের মূল মেরুদণ্ডের ওপর লেগেছে। মাঠের লড়াইয়ে নামার আগেই পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা যেভাবে নিজেদের সেরা একাদশের তারকাদের হারাচ্ছে, তা হেক্সা মিশন বা ট্রফি পুনরুদ্ধারের স্বপ্নকে বড়সড় এক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল।