ঢাকা: জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে বাংলাদেশ কোনো দেশ বা পক্ষের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের প্রয়োজন ও স্বার্থ বিবেচনায় ভারত, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতা করবে সরকার। কোনো সিদ্ধান্তই বাইরের চাপের ভিত্তিতে নেওয়া হবে না।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন অগ্রগতি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক বিষয়, এলপি গ্যাসের বাজার এবং প্রতিরক্ষা ও বেসামরিক বিমান কেনার মতো বিভিন্ন প্রসঙ্গ উঠে আসে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা করবে। ভারত, রাশিয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্র—যে দেশের সঙ্গেই আলোচনা হোক না কেন, বাংলাদেশের অবস্থান হবে জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে।
বিমান কেনার প্রসঙ্গেও তিনি একই অবস্থানের কথা জানান। বোয়িং কিংবা এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্ত কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের চাপের কারণে নেওয়া হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। দেশের প্রয়োজন, সক্ষমতা এবং স্বার্থ বিবেচনা করেই এ ধরনের ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান উপদেষ্টা।
এদিকে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিএনপির কোনো ব্যক্তি বা নেতাকর্মী জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন ডা. জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখবে না। ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ সম্পৃক্ত থাকলে তদন্তের ভিত্তিতে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
ব্রিফিংয়ে বিএনপিকে ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয়টিও উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বিএনপির সঙ্গে ‘চাঁদাবাজি’ শব্দটি জড়িয়ে রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের বিষয় রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই এ নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হয়ে আসছে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিএনপিকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছে। তবে চাঁদাবাজির অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকার শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর করছে না। চাঁদাবাজদের একটি তালিকা সরকারের কাছে রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানান তিনি।
এ সময় দেশের এলপি গ্যাসের বাজার পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি দাবি করেন, দেশে বর্তমানে এলপি গ্যাসের কোনো সংকট নেই। তবে কেউ কৃত্রিমভাবে গ্যাস মজুত করে বাজারে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এলপি গ্যাসের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে—এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্য বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। মজুতদারির মাধ্যমে দাম বাড়ানোর চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে যে ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ছিল, বর্তমানে তা নেই। বর্তমানে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের সামনে থাকা বিভিন্ন সমস্যা একসঙ্গে সমাধান করা সম্ভব না হলেও পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে। প্রশাসনিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন খাতে সরকারের অগ্রগতির মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনা—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন ডা. জাহেদ উর রহমান। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে তিনি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
ভারত, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে আলোচনা চালানোর কথা জানিয়ে তিনি বোঝাতে চান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হবে।
একইভাবে বোয়িং বা এয়ারবাস কেনার মতো বড় ক্রয়ের ক্ষেত্রেও দেশের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি। অর্থাৎ বিমান কেনার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশের চাপ নয়, বরং দেশের পরিবহন চাহিদা ও জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরেছেন উপদেষ্টা।
রাজনৈতিক অঙ্গনে চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রসঙ্গে সরকার আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অবস্থানেও রয়েছে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। পাশাপাশি এলপি গ্যাসের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি বা অতিরিক্ত দাম নেওয়ার চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তাও দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে সচিবালয়ের এই প্রেস ব্রিফিংয়ে সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, বিমান ক্রয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানি বাজার—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টার বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.