কৃষি ও বাণিজ্য প্রতিবেদক: সরকারি পরিসংখ্যানে দেশে পর্যাপ্ত সার মজুতের সুসংবাদ দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তীব্র বিশৃঙ্খলা ও অসন্তোষ থামছে না। সার ব্যবস্থাপনায় নীতিগত অস্থিরতা, ঘনঘন ডিলার নিয়োগের শর্ত বদল এবং স্থানীয় রাজনীতি যুক্ত হওয়ায় উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পর্যাপ্ত সার গুদামে থাকা সত্ত্বেও কৃষকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে, যা অনেক জায়গায় সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুরের মতো অপ্রীতিকর ঘটনায় রূপ নিচ্ছে।
২০০৯ সালের নীতিমালা অনুযায়ী একটি ইউনিয়নে একজন মূল ডিলারের অধীনে নয়জন খুচরা বিক্রেতা নির্ধারণের বিধান ছিল। তবে ২০২৫ এবং পরবর্তী ২০২৬ সালের নতুন নীতিমালায় প্রতি ইউনিয়নে তিনজন ডিলার এবং তাদের পছন্দের দুজন করে খুচরা বিক্রেতা নিয়োগের প্রাক্কলন রাখা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিলার কাঠামোতে এই ঘনঘন রদবদল বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা নষ্ট করছে। কৃষিবিদদের আশঙ্কা, পুরো ইউনিয়নের বদলে সীমিত সংখ্যক ডিলারের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে বাজারে কৃত্রিম মনোপলি বা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়। ওয়ার্ড পর্যায়ে এককভাবে দায়িত্বশীল বিক্রেতা না থাকায় ডিলাররা জবাবদিহিতার বাইরে চলে যাচ্ছে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নিচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে কোনো সার ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। বোরো মৌসুমের চাহিদা মেটাতে আগাম সার আমদানির অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে সরকারি গুদামগুলোতে সার পর্যাপ্ত রয়েছে।
তবে মাঠের চিত্র একেবারেই আলাদা। কুড়িগ্রামসহ একাধিক উত্তরাঞ্চলীয় জেলায় চাহিদা ও বরাদ্দের বিশাল ফারাক দেখা যাচ্ছে। শত শত কৃষক ভোররাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনমতো সার পাচ্ছেন না। অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দাবি করছে, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে সার থাকা সত্ত্বেও মাঠে কেন এই অস্বাভাবিক অস্থিরতা, তা খতিয়ে দেখতে গোয়েন্দা তদারকির তাগিদ দিচ্ছেন কর্মকর্তারা।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ও অভিজ্ঞ ডিলারদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হওয়াতেই এই সংকটের সূচনা। উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ে নতুন ডিলারশিপের আবেদনের বিশাল বহরে অধিকাংশ আবেদনকারীই স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও তাদের অনুসারী।
এর পাশাপাশি ডিলারদের জাতীয় সংগঠন বিএফএ (বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন) নতুন নীতিমালার কিছু অস্পষ্টতা দূর করা এবং বস্তাপ্রতি বিক্রয় কমিশন বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে নিয়োগ স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
বিতরণ ব্যবস্থায় নৈরাজ্য বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। দেশের বিভিন্ন জেলায় মনিটরিং কমিটির সমন্বয়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা জরিমানা এবং মামলা করা হচ্ছে।
ইতিমধ্যে বেশ কিছু এলাকার অনিয়মকারী ডিলারদের লাইসেন্স স্থগিত ও বাতিল করা হয়েছে। কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় কৃষক অসন্তোষ সামাল দিতে না পারা এবং বিতরণে অনিয়মের দায়ে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদেরও তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল প্রশাসনিক শাস্তি বা ডিলার বদল করে সার বাজারের এই অস্থিতিশীলতা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ডিলার করা এবং ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক সুষ্ঠু বিতরণ কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।
সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে সংকট এড়াতে দেশের অঞ্চলভিত্তিক দুই থেকে তিন মাসের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ‘বাফার স্টক’ (জরুরি মজুতাগার) গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। তা না হলে বিপুল আন্তর্জাতিক আমদানির পরও মাঠপর্যায়ে প্রান্তিক কৃষকের ক্ষোভ প্রশমন করা কঠিন হবে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.