রাজনৈতিক প্রতিবেদক: জাতীয় সংসেদের প্রধান বিরোধী দলকে বাইরে রেখেই বহুল আলোচিত সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার পথে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার। এজন্য সংসদীয় 'বিশেষ কমিটি' গঠিত হলেও, 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' গঠিত না হওয়ায় এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে বিরোধী দল। সরকারি দল এখনও বিরোধী দলের জন্য কমিটির পাঁচটি পদ ফাঁকা রেখে তাদের অপেক্ষায় থাকার কথা জানালেও, বিশ্লেষকরা মনে করছেন বিরোধী দলকে অসন্তোষে রেখে সংবিধান পরিবর্তন করা হলে তা অতীতে সৃষ্টি করা রাজনৈতিক সংকটের মতোই প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষাকে ভিত্তি করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বসম্মত আলোচনায় তৈরি হয়েছিল 'জাতীয় জুলাই সনদ'। তৎকালীন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী ২৬টি রাজনৈতিক দল এতে সম্মতি ও স্বাক্ষর জানিয়েছিল। পরবর্তীতে এই সনদকে আইনি ভিত্তি প্রদান করতে 'জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ' জারি করা হয় এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন এ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচনে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে এই আদেশ ও প্রক্রিয়া নিয়ে দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। বর্তমান সরকারি দল ওই আদেশকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ'-এর সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদিকে, বিরোধী দল সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের সদস্য—উভয় পদেই শপথ গ্রহণ করে এবং গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ হুবহু বাস্তবায়নে অনড় অবস্থান গ্রহণ করে।
সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই সংবিধান সংশোধন নিয়ে দুই মেরুতে অবস্থান নেয় সরকারি ও বিরোধী দল। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধী দল রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জনসহ সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে ১৭ সদস্যের সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন এবং তাতে বিরোধীদের ৫ জন প্রতিনিধি দেওয়ার প্রস্তাব করা হলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে।
ফলশ্রুত, বিরোধী দলের জন্য ৫টি পদ ফাঁকা রেখেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে ক্ষমতাসীন বিএনপি ছাড়াও বিজেপি, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
সংসদে বিরোধীদের অনুপস্থিতি সামাল দিতে এবং এই সংশোধন প্রক্রিয়ার সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে বিশেষ কমিটি নানা অংশীজনের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেয়। তবে সেখানেও দেখা গেছে স্পষ্ট বিভাজন।
জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি দলের মধ্যে ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশ নেয় মাত্র ১৫টি দল। বিপরীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলনসহ গুরুত্বপূর্ণ দলগুলো এই সংলাপ বর্জন করে। বৈঠকে উপস্থিত রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন একপর্যায়ে প্রতিবাদ জানিয়ে রুম ত্যাগ করে। জামায়াত জোটভুক্ত দলগুলোর দাবি, গণভোটের রায় ও গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে পাশ কাটিয়ে সরকার সম্পূর্ণ একতরফা পথ বেছে নিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় সংবিধান একটি দেশের মৌলিক ও অভিভাবকতুল্য কাঠামো। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক মনে করেন, বৃহৎ রাজনৈতিক অংশীদারদের বাদ দিয়ে কোনো সংশোধনী আইনগতভাবে পাস করা সম্ভব হলেও রাজনৈতিকভাবে তা কোনো স্থায়ী সমাধান আনে না। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
একই সুর বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর কণ্ঠেও। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অতীতেও জনমত এবং সর্বদলীয় মত উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার করুণ পরিণতি দেশবাসী দেখেছে। সংবিধানের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় সবপক্ষের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত না করা হলে তা ভবিষ্যতে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের মধ্যেই বিশেষ কমিটি তাদের রিপোর্ট জমা দেবে এবং নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনে সংশোধনী বিল আকারে তা সংসদে উত্থাপিত হবে। জয়নুল আবেদীনের মতো জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের আশা, বিল পাসের সময় বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নেবে।
তবে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, জনগণ সংশোধন নয়, সংবিধান সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ফলে 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' ছাড়া কোন অনিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ তারা হবে না এবং রাজপথ ও সংসদ উভয় জায়গাতেই সংস্কারের পক্ষে দাবি জারি রাখবে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.