নিউইয়র্ক প্রতিনিধি: পারস্পরিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘকে মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চায় বাংলাদেশ। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে এই প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ভাষণে তিনি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান, বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে কূটনীতির ভূমিকা, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী জনগণের প্রতি সমর্থন এবং নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বার্তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেন।
ভাষণের সূচনাতেই প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের নবনির্বাচিত সভাপতিকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। এরপর তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। একই সাথে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের অবদানকে স্মরণ করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ ফ্যাসিবাদমুক্ত। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করেন যে, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল জনরায় নিয়ে সরকার গঠন করেছে।
বক্তব্যকালে প্রধানমন্ত্রী তার পিতা, বাংলাদেশের প্রখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অতীতে জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণের স্মৃতি আবেগঘনভাবে স্মরণ করেন।
বিশ্বমঞ্চে রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টানা নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছে। তবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় অধিবাসীদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "রোহিঙ্গা সংকটের সৃষ্টি মিয়ানমারে, তাই এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।" তিনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত এসব মানুষকে নিরাপদে ও সম্মানজনকভাবে তাদের নিজ বাসভূমে ফেরত পাঠাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহায়তা দাবি করেন। একই সঙ্গে চূড়ান্ত প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মানবিক জীবনরক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান এবং সতর্ক করেন যে, আন্তর্জাতিক উদাসীনতা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত এবং তার প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সৃষ্টি হওয়া মন্দা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয় এবং রেকর্ড মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ করে তুলছে।
যেকোনো আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ও মতপার্থক্য নিরসনে শক্তিপ্রয়োগের বদলে আলোচনা, দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা ও পারস্পরিক সম্মান।
সামরিক খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন বাজেট কমিয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করা বৈশ্বিক শান্তির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ সর্বদা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ, নিরস্ত্রীকরণ এবং বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবিচল অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, জাতিসংঘের পিসবিল্ডিং কমিশনের ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারী সদস্যদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা (WPS) এজেন্ডা বাস্তবায়নে দেশের সুদৃঢ় অঙ্গীকারের প্রমাণ।
পরিশেষে, একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন এবং শান্তিময় বিশ্ব গঠনে বাংলাদেশকে সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের পাশে রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণ সমাপ্ত করেন।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.