দেশে হামের সংক্রমণ ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হেলথ বুলেটিনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৯৩৬ শিশু। নিশ্চিত হাম এবং হামের উপসর্গ—দুই হিসাব মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৬ জনে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে দেশের সর্বশেষ হাম পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৩১৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এই সময়ে ঢাকা বিভাগে ৪৮৪ জনকে হাম বা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮১ জন এবং সিলেট বিভাগে ১৯৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বরিশালে ১২৫ জন, খুলনায় ৯৮ জন, ময়মনসিংহে ৮২ জন, রাজশাহীতে ৩০ জন এবং রংপুর বিভাগে ১৯ জন রোগী নতুন করে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে।
অর্থাৎ, একদিনেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা হাম পরিস্থিতির ওপর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব আরও বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাব পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৭৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।
এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮৬ জন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে আসছে।
হাম বা এর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তে থাকায় শিশুদের পাশাপাশি পরিবার ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর মোট সংখ্যা ১ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫৯ জনে পৌঁছেছে।
তাদের মধ্যে পরীক্ষাসহ সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য তথ্যের ভিত্তিতে ২০ হাজার ২০১ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ সন্দেহজনক রোগীর একটি বড় অংশকে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হয়েছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এর বিস্তার দ্রুত ঘটতে পারে। জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে র্যাশসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় আক্রান্ত শিশুর নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা কিংবা অন্যান্য জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চলতি বছরের পরিসংখ্যানে নিশ্চিত হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১০০ জন। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি—৯৩৬ জন।
এই দুই শ্রেণির হিসাব একত্র করলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৩৬ জনে দাঁড়ায়। সর্বশেষ একদিনে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হওয়ায় এই সংখ্যা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া প্রত্যেক শিশুর মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামজনিত—এমন দাবি করা যায় না। কারণ উপসর্গের সঙ্গে অন্যান্য রোগ বা জটিলতাও থাকতে পারে। তাই নিশ্চিত হাম ও সন্দেহজনক/উপসর্গভিত্তিক মৃত্যুর তথ্য আলাদাভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে।
প্রতিদিন নতুন করে এক হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় দেশের হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু রোগীদের চিকিৎসা দিতে হাসপাতালগুলোকে অতিরিক্ত প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
একদিকে নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে, অন্যদিকে আগের রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ১ লাখ ৫৩ হাজারের বেশি রোগীর মধ্যে ১ লাখ ৪৭ হাজারের বেশি চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছে।
হাম পরিস্থিতিতে শিশুদের অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করা জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক তথ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিচ্ছে। নতুন রোগী, হাসপাতালে ভর্তি, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা এবং মৃত্যুর তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কোন এলাকায় সংক্রমণের চাপ বেশি তা চিহ্নিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার এবং নিশ্চিত হাম আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি। ফলে শিশুদের সুরক্ষা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবার ও সাধারণ মানুষের সচেতনতার ওপরও গুরুত্ব বাড়ছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.