দেশের হস্তচালিত বেকারি শিল্পে একের পর এক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের পাশাপাশি ময়দা, চিনি, তেল, ডালডা, ডিম, দুধ, ইস্টসহ প্রায় সব ধরনের কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে কারখানার ভাড়া, শ্রমিকের বেতন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অপরিবর্তিত থাকায় ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশের অন্তত ১২০০ হস্তচালিত বেকারি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় নিয়মিত চুলা চালানো যাচ্ছে না। আবার যেসব পণ্য উৎপাদনে বিদ্যুৎ প্রয়োজন, সেসব কারখানায় লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ কিছু উদ্যোক্তা বাড়তি খরচে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করছেন।
বেকারি শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, গত কয়েক মাসে কাঁচামালের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ উৎপাদন কমে গেলেও শ্রমিকের বেতন, কারখানার ভাড়া, পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয় কমেনি। ফলে আয় কমলেও ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। এতে অনেক ছোট উদ্যোক্তা লোকসানের মুখে পড়েছেন এবং কেউ কেউ ধারদেনা করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল হক রেজু বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সমিতির প্রায় ১২ হাজার সদস্য ব্যবসায়িক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর দাবি, অধিকাংশ বেকারি কারখানা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না।
তিনি জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনেক সময় তিন ঘণ্টার মতোও গ্যাসের চাপ পাওয়া যায় না। পাশাপাশি কিছু বেকারি পণ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। সেক্ষেত্রে নিয়মিত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলেও লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতনসহ বিভিন্ন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।
রেজাউল হক রেজুর ভাষ্য, অধিকাংশ বেকারি উদ্যোক্তা স্বল্প পুঁজির ব্যবসা পরিচালনা করেন। উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি ব্যয়ও কমত, তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদন কমলেও খরচ কমেনি; বরং কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেকারি শিল্পের কাঁচামালের বাজারেও গত কয়েক মাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। উদ্যোক্তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আগে প্রতি বস্তা ময়দার দাম ছিল প্রায় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ২৫০ টাকা। বর্তমানে সেটি ৩ হাজার ১৫০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায় উঠেছে। একইভাবে এক বস্তা চিনির দাম ৪ হাজার ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ৯০০ টাকা হয়েছে।
তেলের দামও বেড়েছে। আগে প্রতি ড্রাম তেলের দাম প্রায় ২ হাজার ৭০০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ৩ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডালডার দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩ হাজার টাকা। ডিমের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে ৭ টাকায় পাওয়া একটি ডিম কিনতে এখন প্রায় ১১ টাকা খরচ হচ্ছে। এর পাশাপাশি দুধ, ইস্ট, পলিব্যাগসহ অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে উৎপাদিত বেকারি পণ্যের দাম পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার থেকে রুটি, বিস্কুট, পাউরুটি ও কেকসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অধিকাংশ পণ্যের দাম প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে।
তবে সমিতির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট মূল্যতালিকা ঘোষণা করা হয়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। পুরোনো দামে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা উদ্যোক্তাদের জন্য আর সম্ভব হচ্ছে না।
জালাল উদ্দিনের মতে, সরকারের কাছ থেকে দ্রুত সহযোগিতা না পাওয়া গেলে ক্ষুদ্র বেকারি ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হতে পারেন। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ছোট কারখানাগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে।
দাম সমন্বয়ের আগে কয়েক দিন অনেক বেকারি পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ রেখেছিল। এর প্রভাব স্থানীয় বাজারেও পড়ে। বিভিন্ন মুদি দোকানে পাউরুটি ও অন্যান্য বেকারি পণ্যের সরবরাহ কমে যায়। চায়ের দোকান ও ফুটপাতের ছোট খাবারের দোকানগুলোতেও রুটি, বিস্কুট ও কেকের সংকট দেখা দেয়। এতে সাধারণ ক্রেতা ও শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন খাবারের তালিকাতেও প্রভাব পড়ে।
নতুন দামের একটি ধারণা দিতে গিয়ে রেজাউল হক রেজু জানান, ৫০ টাকার পাউরুটি এখন ৬০ টাকা হতে পারে। ১০ টাকার বনরুটির দাম নির্ধারণ করা হতে পারে ১৫ টাকা এবং ১০ টাকার কেকের দামও ১৫ টাকা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ৫ টাকার বিস্কুটের দাম একই রাখা হলেও আকার কিছুটা ছোট করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাজারের ক্রয়ক্ষমতা ও ভোক্তাদের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পণ্যের দাম যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কোনো কোনো পণ্যে দাম ২০ শতাংশের বেশি বাড়ার মতো দেখালেও আকার বা পরিমাণে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে বিষয়টি সমন্বয় করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাড়তি উৎপাদন ব্যয় দেশের ক্ষুদ্র বেকারি শিল্পকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, দ্রুত গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া না হলে আরও অনেক ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে শুধু উদ্যোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় কম দামের খাবারের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.