সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মৌখিক বা ভাইভা পরীক্ষার নম্বর অস্বাভাবিক হারে বাড়ানোর একটি প্রশাসনিক উদ্যোগে দেশজুড়ে চরম ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটি ‘মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও এর আওতাধীন দপ্তরগুলোর ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মানবণ্টন বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়ায় এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে ভাইভার নম্বর ক্ষেত্রভেদে ২৫ থেকে ৫০ করার কথা বলা হয়েছে, যা বর্তমান ব্যবস্থার চেয়ে সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ তৈরি হয়েছে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায়। শিক্ষাবিদ, প্রশাসনিক বিশ্লেষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনগুলো কঠোর ভাষায় এই প্রস্তাবের নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, মৌখিক পরীক্ষা মূলত পরীক্ষকদের ব্যক্তিগত মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নম্বর বাড়িয়ে দিলে সেখানে পছন্দের প্রার্থীকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে করে লিখিত পরীক্ষায় ভালো ফল করা প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হবেন এবং স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের সুযোগ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। বিশেষ করে বিসিএসেও ভাইভার নম্বর ১০০ থেকে বাড়িয়ে আবারও ২০০ নম্বরে ফেরানোর বিষয়ে পরোক্ষ আলোচনার খবর ছড়িয়ে পড়ায় ক্ষোভের মাত্রা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পিএসসি)-এর তৎকালীন চেয়ারম্যানের আকস্মিক পদত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন গুঞ্জন তৈরি হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ভাইভা নম্বর দ্বিগুণ করার প্রস্তাবে সম্মতি না দেওয়ায় তিনি পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তবে পিএসসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ৪৭তম বিসিএস থেকে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০০-তেই বহাল রাখা হয়েছে এবং এটি পরিবর্তন করতে আইনি সংশোধনের প্রয়োজন হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকেও দাবি করা হয়েছে যে, প্রক্সি পরীক্ষা, ইলেকট্রনিক জালিয়াতি ও এআই ডিভাইসের অসদুপায় ঠেকাতেই ভাইভার গুরুত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা ভাবনাচিন্তা করা হয়েছিল, তবে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।
এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দেশের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ (ঢাবি) রাজশাহী, খুলনা, বেগম রোকেয়া এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে রাতে মশাল মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতারা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—ভাইভার নামে কোনো ধরনের প্রহসন বা স্বজনপ্রীতির সুযোগ তরুণ সমাজ মেনে নেবে না। অবিলম্বে এই প্রস্তাবিত খসড়া বাতিল না করা হলে আন্দোলন সমগ্র দেশে বিস্তৃত করা হবে বলে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন থেকেও সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ রাখা ও শতভাগ মেধার মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.