ববি প্রতিনিধি:
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন ভোলা রোড এলাকায় একটি বাসায় নারী-পুরুষকে আপত্তিকর অবস্থায় পাওয়ার প্রতিবাদ করাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের তিন নেতাকে স্থানীয়দের মারধরের অভিযোগ উঠেছে। পরে তাদের উদ্ধারে গিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা স্থানীয় একটি পরিবারের সদস্যদের মারধর এবং বাসাবাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছেন বলেও পাল্টা অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) গভীররাতে আনুমানিক ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ৯ নম্বর ওয়ার্ডের রহিমের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। রহিমের স্ত্রী শিল্পী বেগম চরকাউয়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য। স্থানীয়দের দাবি, রহিমের বিরুদ্ধে এর আগেও থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
আহত ছাত্রদল নেতারা হলেন—বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক পিয়াস আহমেদ রিফাত, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল মোল্যা ও অপর এক নেতা রায়হান। অন্যদিকে স্থানীয় পরিবারের আহত সদস্যরা হলেন শিল্পী বেগম, তার স্বামী রহিম, ছেলে আরমান ও জামাতা রিয়াজ।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোমবার রাতে ছাত্রদলের তিন নেতা পিয়াস আহমেদ রিফাত, আশরাফুল মোল্ল্যা ও রায়হান ভোলা রোডের একটি বেকারি থেকে পাউরুটি ও নাস্তা নিয়ে ফেরার পথে দুই তরুণের সঙ্গে এক তরুণীকে একটি বাসায় প্রবেশ করতে দেখেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে তারা ওই ব্যক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কি না, তা জানার জন্য তাদের অনুসরণ করে ভবনের সামনে যান।
পরে ভবনের বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত রহিমকে বিষয়টি জানানো হয়। প্রথমে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সংশ্লিষ্ট কক্ষে নক করেন বলে দাবি করা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর দরজা খুললে কক্ষের ভেতরে এক তরুণ ও দুই তরুণীকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পান বলে ছাত্রদল নেতারা দাবি করেন। পুরো ঘটনাটি ভিডিও ধারণ করা হয়েছে বলেও তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
ছাত্রদল নেতাদের আরও দাবি, ওই কক্ষ থেকে ইয়াবা বা মাদকদ্রব্যও পাওয়া যায়। পরে সংশ্লিষ্ট তরুণ-তরুণীদের অভিভাবকদের ঘটনাস্থলে ডাকা হয় বলে জানা গেছে। এর কিছুক্ষণ পর রহিম বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এক নেতার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন বলে অভিযোগ করেন ছাত্রদল নেতারা।
ছাত্রদল নেতাদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা ওই ব্যক্তিদের অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি জানতে পারেন। পরে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর রহিমের জামাতা রিয়াজ ও ছেলে আরমান ‘ডাকাত’ বলে চিৎকার শুরু করেন এবং একপর্যায়ে দুই ছাত্রদল নেতাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঘরে আটকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেন তারা।
আহত ছাত্রদল নেতা আশরাফুল মোল্ল্যা বলেন, “আমরা রাতে হাঁটাহাঁটির জন্য বের হলে দুইজন মেয়েকে ও একজন ছেলেকে দেখতে পাই। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করি। একপর্যায়ে অর্থের বিনিময়ে মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হলে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি। পরে আমাদের দেখিয়ে দেওয়ার কথা বলে ডাকাত ডাকাত বলে চিৎকার শুরু করে। একপর্যায়ে আমাদের বেঁধে বেধড়ক মারধর করা হয়। রায়হান বের হয়ে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ডেকে এনে আমাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।”
অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা রহিম মিয়া বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব শিক্ষার্থী ডাকাতির উদ্দেশ্যে বাইরে থেকে মেয়ে এনে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়। আমাদের জিম্মি করে তারা ডাকাতি করতে চেয়েছিল। আমরা তাদের প্রতিহত করেছি। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়েছে। তারা যাওয়ার সময় আমাদের বাড়িঘর তছনছ করেছে এবং বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার জামাই ও স্ত্রী হাসপাতালে ভর্তি। আমি ভয়ে বাড়ির বাইরে পালিয়ে আছি।”
ঘটনার একপর্যায়ে তিন ছাত্রদল নেতার মধ্যে রায়হান কোনোভাবে ঘটনাস্থল থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থী ও নেতাকর্মীদের খবর দেন। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আটক নেতাদের উদ্ধার করেন। এ সময় স্থানীয় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয় বলে জানা গেছে। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওই পরিবারের সদস্যদের মারধর, বাসাবাড়িতে ভাঙচুর ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
০৯ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য জুয়েল হোসেন বলেন, “ঘটনাটি আমার বাড়ির পাশেই। চিৎকার শুনে রাতে ঘুম থেকে উঠে মারামারির ঘটনা দেখি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী এসে বাড়িঘর লুটপাট করেছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রদল নেতা পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সময় পরীক্ষার ফরম পূরণের নামে চাঁদা দাবি করেছে। তাদের এরকম একটা ব্যবস্থা হওয়া উচিত ছিল।” তবে এ বিষয়ে ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বললে তারা এসব টাকা দিতে নিষেধ করেছেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে ঘটনার সঙ্গে মাদকের অর্থ সম্পর্কিত লেনদেনের বিষয় জড়িত থাকার গুঞ্জন থাকলেও উভয় পক্ষই তা অস্বীকার করেছে।
বরিশাল বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসমাইল হোসেন বলেন, “মোবাইল ফোনে তথ্য পেয়ে আমাদের টহল টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আহত একজনকে উদ্ধার করে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় এখনো কোনো পক্ষ মামলা করেনি। মামলা হলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
এ ঘটনায় আহত ছাত্রদল নেতাসহ স্থানীয় পরিবারের সদস্যরা বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.