দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অনুমোদিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা সম্ভব হলে আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ‘জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬’-এর গেজেট প্রকাশ হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে গত সোমবার সরকার নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন করে। অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী নতুন বেতনস্কেল এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দেশনাগুলো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বাস্তবে বর্ধিত বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছিলেন, চলতি সপ্তাহেই এ বিষয়ে আদেশ জারি হতে পারে। তবে এর আগে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সম্পন্ন করতে হবে। ভেটিং শেষে বিধিবদ্ধ সরকারি আদেশ বা এসআরও জারির মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এর রেজুলেশন প্রস্তুত করা হয়েছে। এরপর সেটি বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় বা বিজি প্রেসে পাঠানো হয়েছে।
বিজি প্রেসের প্রক্রিয়া শেষে নথি আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে আসবে। সেখান থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। প্রয়োজনীয় আইনি যাচাই শেষ হওয়ার পর এসআরও নম্বর দেওয়া হবে। সবশেষে গেজেট আকারে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ প্রকাশ করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পে-স্কেল নিয়ে কাজ করা এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গেজেট প্রকাশে অযথা সময়ক্ষেপণের কোনো পরিকল্পনা নেই। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করতে যতটুকু সময় প্রয়োজন, মূলত সেই সময়ই লাগছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন জাতীয় বেতনস্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রেড সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলেও প্রতিটি গ্রেডের মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শতাংশ হারে বেতন বাড়ছে ২০তম গ্রেডে। এই গ্রেডের কর্মচারীদের বর্তমান সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল বেতনের ক্ষেত্রে প্রায় ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মূল বেতন দ্বিগুণ বা ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন কাঠামোতেই বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে।
তবে নতুন বেতনস্কেলে কর্মচারীরা একবারে পুরো বর্ধিত মূল বেতন পাবেন না। সরকারের ওপর একসঙ্গে বড় আর্থিক চাপ এড়াতে বাড়তি বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন ও বর্তমান মূল বেতনের পার্থক্যের ৫০ শতাংশ প্রথম ধাপে যুক্ত হবে। দ্বিতীয় ধাপে বাড়তি অংশের ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ যোগ হবে।
অন্যদিকে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ প্রথম ধাপে কার্যকর হবে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৩০ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে বাকি ৩০ শতাংশ যুক্ত হয়ে চূড়ান্ত বেতন নির্ধারিত হবে।
২০তম গ্রেডের একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বর্তমান মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে নতুন কাঠামোতে তা ২০ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ মোট বাড়তি ১১ হাজার ৭৫০ টাকা। প্রথম ধাপে এর অর্ধেক, অর্থাৎ ৫ হাজার ৮৭৫ টাকা যোগ হয়ে মূল বেতন দাঁড়াবে ১৪ হাজার ১২৫ টাকা।
পরবর্তী ধাপে বাড়তি অংশের আরও ২৫ শতাংশ বা ২ হাজার ৯৩৭ টাকা ৫০ পয়সা যুক্ত হলে মূল বেতন হবে ১৭ হাজার ৬২ টাকা ৫০ পয়সা। তৃতীয় ধাপে একই পরিমাণ যুক্ত হয়ে চূড়ান্ত মূল বেতন ২০ হাজার টাকায় পৌঁছাবে।
প্রথম গ্রেডেও একইভাবে ধাপে ধাপে বেতন পূর্ণ কাঠামোয় যাবে। বর্তমান ৭৮ হাজার টাকা থেকে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। বাড়তি ৭৮ হাজার টাকার ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৩১ হাজার ২০০ টাকা প্রথম ধাপে যুক্ত হলে মূল বেতন দাঁড়াবে ১ লাখ ৯ হাজার ২০০ টাকা।
দ্বিতীয় ধাপে আরও ২৩ হাজার ৪০০ টাকা যোগ হয়ে তা হবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৬০০ টাকা। তৃতীয় ধাপে সমপরিমাণ অর্থ যুক্ত হলে চূড়ান্ত মূল বেতন দাঁড়াবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
নবম গ্রেডের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। বর্তমান ২২ হাজার টাকা থেকে এই গ্রেডের মূল বেতন ৪৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিন ধাপে তা যথাক্রমে ৩০ হাজার ৮০০ টাকা, ৩৭ হাজার ৪০০ টাকা এবং শেষ ধাপে ৪৪ হাজার টাকায় পৌঁছাবে।
দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল অনুমোদন হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ইতোমধ্যে ব্যাপক স্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তঃমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম।
তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে থাকা সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির বিষয়। বিশেষ করে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করাকে তিনি যৌক্তিক বলে মনে করেন।
তবে শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, সরকারি চাকরির নিম্নস্তরের কর্মচারীদের পদোন্নতির বিষয়েও দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার দাবি, ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য যেভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা হয়, নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, অনেক কর্মচারী নির্ধারিত ফিডার পদে দীর্ঘ সময় কাজ করার পরও বছরের পর বছর পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন। তাই পদ খালি না থাকলেও বিশেষ ব্যবস্থায় পদোন্নতির সুযোগ তৈরির দাবি রয়েছে।
সব মিলিয়ে নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ এখন সরকারি চাকরিজীবীদের অন্যতম প্রত্যাশিত বিষয়। গেজেট প্রকাশের পর বেতন কাঠামোর বিস্তারিত নির্দেশনা আরও স্পষ্ট হবে। এরপর নির্ধারিত ধাপ অনুযায়ী বর্ধিত বেতন বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু হবে। দীর্ঘদিন পর নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি এর আর্থিক প্রভাব দেশের বাজেট ও অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.