চীন থেকে জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার সংগ্রহের ক্ষেত্রে শুধু একটি দেশের বিকল্প বিবেচনা করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের বিভিন্ন যুদ্ধবিমান নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পরে বাংলাদেশের প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনায় চীনের জে-১০কে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক বিকল্প হিসেবে মনে হয়েছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়টি হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এটি দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত। সামরিক সক্ষমতার ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনা করে ‘ফোর্সেস গোল’-এর আওতায় এ ধরনের যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, একই ধরনের সক্ষমতাসম্পন্ন বিভিন্ন যুদ্ধবিমানের মূল্য, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহারিক সুবিধা নিয়ে তুলনামূলক হিসাব করা হয়েছে। সেই হিসাবেই চীনের তৈরি জে-১০ যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের জন্য আর্থিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে বলে মনে হয়েছে।
তিনি বলেন, একই ধরনের সক্ষমতার যুদ্ধবিমান তুলনামূলক কম ব্যয়ে সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। ব্যয়ের পার্থক্য হিসাব করলে তা অন্য কিছু বিকল্পের তুলনায় অর্ধেকেরও নিচে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি হতে পারে।
অর্থাৎ শুধু যুদ্ধবিমানের ক্রয়মূল্য নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা ও প্রয়োজনের বিষয়টিও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বর্তমান সক্ষমতা নিয়েও ব্রিফিংয়ে কথা বলেন ডা. জাহেদ উর রহমান। তার বক্তব্যে উঠে আসে, দেশের হাতে থাকা যুদ্ধবিমানগুলোর একটি বড় অংশ পুরোনো হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে মিগ-২৯ রয়েছে। তবে বর্তমানে এসব যুদ্ধবিমান খুব অল্পসংখ্যক এবং সবগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যকর নয়। অন্যদিকে, বিমানবাহিনীর বহরে থাকা এফ-৭ যুদ্ধবিমানগুলো অনেক পুরোনো।
এ পরিস্থিতিতে বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন প্রজন্মের মাল্টিরোল ফাইটার যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আধুনিক যুদ্ধবিমান শুধু আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য নয়, বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযানে ব্যবহারের সক্ষমতাও দিতে পারে। ফলে নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহকে সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখছে সরকার।
জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নিয়ে কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলেও স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি জানান, আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার সংগ্রহের পরিকল্পনা বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল’-এর মধ্যেই রয়েছে।
দেশের সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ কাঠামো, জনবল, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় বিভিন্ন সময় ‘ফোর্সেস গোল’ প্রণয়ন করা হয়। সেই পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ কারণে জে-১০ কেনার বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে প্রতিরক্ষা খাতের দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখার কথা জানিয়েছেন তিনি।
নতুন যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি অতীতে মিগ-২৯ কেনাকে ঘিরে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সে সময় মামলা ও বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছিল।
তাই এবার যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়ায় সরকার আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সতর্ক থাকবে বলে জানান তিনি। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার মতো বড় আর্থিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ—এমন বার্তাই তার বক্তব্যে উঠে আসে।
জে-১০ কেনার বিষয়ে চূড়ান্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে গেলে এর মূল্য, সংখ্যা, সরবরাহের সময়সূচি এবং অন্যান্য কারিগরি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এসব বিষয় কীভাবে নির্ধারিত হয়, সেটিও সরকারের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সামনে আসবে।
এদিকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নও ওঠে প্রেস ব্রিফিংয়ে। তবে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তথ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার এখনো এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। ফলে এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে মন্তব্য করার সুযোগ নেই।
তিনি আরও জানান, যদি কোনো ধরনের চুক্তি হয়ে থাকে, তাহলে সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানাবে। এ ধরনের চুক্তি গোপন রাখার কোনো কারণ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চুক্তি সম্পন্ন হলে সেটি প্রকাশ করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
একই ব্রিফিংয়ে জে-১০ যুদ্ধবিমান এবং বোয়িং উড়োজাহাজ প্রসঙ্গ সামনে আসায় বাংলাদেশের বিমান খাতের দুই ভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একদিকে বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য নতুন মাল্টিরোল ফাইটার সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, অন্যদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহ নিয়েও আলোচনা চলছে।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অংশ। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের বিকল্প বিশ্লেষণের পর ব্যয় ও সক্ষমতার সমন্বয়ে চীনা বিকল্পকে সুবিধাজনক মনে করা হয়েছে।
তবে যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ডা. জাহেদ উর রহমান। একই সঙ্গে বোয়িং কেনার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জনগণকে জানাবে বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নের পরিকল্পনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে পুরোনো যুদ্ধবিমানগুলোর সক্ষমতা, নতুন মাল্টিরোল ফাইটারের প্রয়োজনীয়তা এবং বড় ধরনের প্রতিরক্ষা ক্রয়ে স্বচ্ছতা—এই তিনটি বিষয়ও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.