দেশে অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অস্ত্রের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তাকারীদের উৎসাহিত করতে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা’ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা জানান।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ইতোমধ্যে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট এ কাজে যুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহযোগিতা নিয়ে ইউনিটটি কাজ শুরু করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা অবৈধ অস্ত্র এবং বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অস্ত্র উদ্ধারের কাজে সাধারণ মানুষের সহযোগিতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে অস্ত্রের সন্ধান দিতে যারা সহায়তা করবেন, তাদের পুরস্কৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তথ্যদাতাদের উৎসাহিত করতে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে পুরস্কারের পরিমাণ তথ্যের গুরুত্ব ও অস্ত্র উদ্ধারে তার কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, পুলিশের কার্যক্রমকে আরও জনবান্ধব ও মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের পাশাপাশি পুলিশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পুলিশকে একটি জনপ্রত্যাশিত ও জনবান্ধব বাহিনীতে পরিণত করার প্রচেষ্টা চলছে। ধীরে ধীরে পুলিশের কার্যক্রমে আরও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
অবৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি দেশে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানও জোরদার করা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে পুলিশকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো এলাকায় চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি বরদাশত করা হবে না বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশের বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। আন্দোলনের পর ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলো ধীরে ধীরে পুনরায় কার্যক্রমে ফিরেছে। অনেক জায়গায় পুলিশি কার্যক্রম স্বাভাবিক হলেও লুট হওয়া সব অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩২৬টি অস্ত্রের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে গেলে তা ভবিষ্যতে জননিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ ইউনিট গঠনের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য কাজে লাগিয়ে অস্ত্রের অবস্থান শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার কথাও জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, লুট হওয়া অস্ত্র দ্রুত উদ্ধার করা গেলে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে সংঘটিত সম্ভাব্য অপরাধের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ধারাবাহিক অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অস্ত্র উদ্ধারে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পাওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণাকেও কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী চক্র বা অবৈধ অস্ত্রের অবস্থান সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ে থাকা তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দ্রুত পৌঁছানো গেলে অভিযান পরিচালনা সহজ হয়।
তবে অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি এসব তথ্যদাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ অবৈধ অস্ত্রের সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে তথ্য দেওয়া ব্যক্তিরা পরবর্তীতে হুমকি বা হয়রানির শিকার হতে পারেন। তাই তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি গোপনীয়তা রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজারবাগে অনুষ্ঠিত অপরাধ পর্যালোচনা সভায় দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি উঠে আসে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি করতে পুলিশকে দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ানো এবং বাহিনীর ভাবমূর্তি উন্নত করার কাজও অব্যাহত থাকবে।
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ ইউনিটের কার্যক্রম এবং সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা এখন মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই দেখার বিষয়। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, গোয়েন্দা তথ্য, পুলিশের অভিযান এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতার সমন্বয়ে দ্রুত এসব অস্ত্রের বড় একটি অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.