আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির আকার ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতির আকারের দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশকে পেছনে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের।
কানাডাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের ‘দ্য ১৫০ ট্রিলিয়ন ডলার গ্লোবাল ইকোনমি ইন ২০৩০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আইএমএফের পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক আকারের তুলনামূলক চিত্র প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকায় ২০৩০ সালের সম্ভাব্য জিডিপির হিসাবে বাংলাদেশকে ৬৭৭ বিলিয়ন ডলার নিয়ে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের ওপরে অবস্থান করতে দেখা গেছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালে মালয়েশিয়ার অর্থনীতির আকার হতে পারে প্রায় ৬৭২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ভিয়েতনামের জিডিপি ৬৬৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন এবং থাইল্যান্ডের ৬৪৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার যথাক্রমে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন, ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন এবং ২৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বেশি হতে পারে।
অর্থনীতির আকারের এই তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়া ও এশিয়ার বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু মোট জিডিপির আকার দিয়ে একটি দেশের মানুষের জীবনমান বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। জনসংখ্যা, মাথাপিছু আয়, উৎপাদনশীলতা, মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের মতো বিষয়ও অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
তালিকায় বাংলাদেশের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে ডেনমার্কও। ২০৩০ সালে দেশটির জিডিপি প্রায় ৫৮৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনীতির আকার ডেনমার্কের চেয়েও বড় হতে পারে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালেও বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ওই সময় দেশটির মোট জিডিপি প্রায় ৩৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভোক্তা বাজার, প্রযুক্তি খাত, আর্থিক ব্যবস্থা ও উৎপাদনশীলতা দেশটির অর্থনৈতিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীনের অবস্থানও বজায় থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। ২০৩০ সালে চীনের অর্থনীতির আকার প্রায় ২৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরের অবস্থান নিয়ে অবশ্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে।
বিশেষ করে জার্মানি ও ভারতের মধ্যে ব্যবধান খুবই কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালে জার্মানির জিডিপি প্রায় ৬ হাজার ১৭৮ বিলিয়ন ডলার এবং ভারতের জিডিপি প্রায় ৬ হাজার ১৭৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ দুই দেশের অর্থনীতির আকারের ব্যবধান হতে পারে মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলার।
একই তালিকায় যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির আকার ২০৩০ সালে প্রায় ৫ হাজার ১৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের বড় অর্থনীতির তালিকায় জাপান, ফ্রান্স, ব্রাজিল, ইতালি ও কানাডার অবস্থানও থাকার কথা বলা হয়েছে।
ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের প্রতিবেদনে বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যও তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বের পাঁচটি বৃহত্তম অর্থনীতি মিলেই বৈশ্বিক জিডিপির ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশের মতো উৎপাদন করে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই বিশ্বের মোট অর্থনীতির এক-চতুর্থাংশের বেশি অংশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।
এতে বোঝা যায়, বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো কয়েকটি শক্তিশালী দেশের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো দ্রুত বড় হচ্ছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেদের অংশ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আইএমএফের পূর্বাভাসে শুধু বাংলাদেশের নয়, সামগ্রিক বিশ্ব অর্থনীতির সম্প্রসারণের চিত্রও উঠে এসেছে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির আকার প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট অর্থনীতির আকার ১৫০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ আগামী কয়েক বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনও দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য জিডিপির পূর্বাভাস নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্থনৈতিক মাইলফলকের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্যবসার পরিবেশ শক্তিশালী করাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
আইএমএফের পূর্বাভাস তাই বাংলাদেশের জন্য যেমন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে, তেমনি সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোর কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার পাশাপাশি সেই প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের জীবনমান, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে—সেটিই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হয়ে থাকবে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.