হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপালে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। নেপাল পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৯ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনো প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
বুধবার সকালে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় হঠাৎ বন্যা ও ভূমিধস শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যে প্রবল পানির স্রোত ও পাহাড়ি ধ্বংসাবশেষ বিভিন্ন জনপদে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, সীমান্ত অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বত অংশেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে এই দুর্যোগে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। সেখানে আরও ৫৫৮ জনের নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া গেছে। ফলে নেপাল ও তিব্বত—দুই পাশ মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি।
দুর্যোগে নিখোঁজ ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ বিদেশি নাগরিক ও পর্যটক বলে জানিয়েছে নেপাল। দেশটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ১৭৮ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। নেপালের ১২৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ নাগরিকও নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন। এ ছাড়া সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যদেরও একটি অংশ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের জনপ্রিয় পর্যটন ও বাণিজ্যিক যোগাযোগপথে এই দুর্যোগ আঘাত হানায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। চীনের গিরং স্থলবন্দর দুই দেশের মধ্যে পর্যটক ও যানবাহন চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে স্থলবন্দরটির বড় অংশ দৃশ্যত বিধ্বস্ত হয়েছে। সীমান্ত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা এবং দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, হিমবাহ ধস এবং পাহাড়ি ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকেই এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ের ওপর জমে থাকা বরফ ও ধ্বংসাবশেষ হঠাৎ নিচে নেমে এলে নদী ও জলধারায় অস্বাভাবিক পরিমাণ পানি ও পলি জমা হয়। এতে স্বাভাবিক নদীপথ বাধাগ্রস্ত হয়ে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ বন্যা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে একটি বিপদ শেষ হওয়ার পরও ঝুঁকি থেকে যায়। নদীতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে গেলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেই জমে থাকা পানি বা ধ্বংসাবশেষের বাঁধ ভেঙে গেলে নতুন করে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। ইউএসজিএসও নদীগুলোতে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষের কারণে আরও বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।
এই আশঙ্কায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দলকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক এবং সেতু, কাদামাটি ও পাথরের স্তূপ উদ্ধারকাজকে জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনেকেই দুর্গম এলাকায় আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বৃহস্পতিবার ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। তিনি নুয়াকোট জেলার বিদুর ও আশপাশের জনপদ ঘুরে পরিস্থিতি দেখেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অবস্থা এবং উদ্ধার কার্যক্রম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য নেন।
নেপালের জন্য এই দুর্যোগের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিখোঁজদের সন্ধান ও পরিচয় শনাক্ত করা। বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক নিখোঁজ থাকায় তাদের পরিবার ও নিজ নিজ দেশের কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান সম্পর্কে দ্রুত নিশ্চিত হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
চীনের তিব্বত অংশেও উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বৃহস্পতিবার ক্ষতিগ্রস্ত তিব্বত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এর আগে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে সর্বাত্মক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ দেন।
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য দুর্যোগের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। হিমালয় অঞ্চলে খাড়া পাহাড়, সরু উপত্যকা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়া রয়েছে। কোনো একটি এলাকায় অতিবৃষ্টি, হিমবাহ ধস বা পাহাড়ি ঢল শুরু হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তার প্রভাব নিচের জনপদে পৌঁছে যেতে পারে।
এই ঘটনার পর হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হিমবাহের পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা ও টেকসই অবকাঠামোর গুরুত্ব আরও বাড়ছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার নিখোঁজদের উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া। একই সঙ্গে নদীতে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ নতুন বন্যার কারণ হতে পারে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস শুধু প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতির ঘটনা নয়; এটি হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান দুর্যোগঝুঁকিরও একটি বড় উদাহরণ। শত শত মানুষের মৃত্যু এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের নিখোঁজ থাকার ঘটনায় এখন উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.