বছরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে প্রাথমিক ধাপে ভোটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে কমিশন।
বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। সাক্ষাৎ শেষে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কমিশনের পরিকল্পনার কথা জানান সিইসি।
দেশে সামনে বড় পরিসরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, প্রায় ৫০০ উপজেলা এবং সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন ধাপে ধাপে আয়োজন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে সব ইউনিয়ন পরিষদে ভোট না হয়ে যেসব পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য উপযুক্ত, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সিইসির বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য সাধারণত তফসিল ঘোষণার পর ভোট আয়োজন পর্যন্ত প্রায় দুই মাস সময় প্রয়োজন হয়। এ কারণে চলতি বছরের মধ্যে ভোট শুরু করতে হলে তফসিলও চলতি বছরের মধ্যেই ঘোষণা করতে হবে বলে জানিয়েছেন সিইসি।
তিনি জানান, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। সেপ্টেম্বরে তফসিল দেওয়া সম্ভব হলে বছরের শেষ দিকে কোনো কোনো ইউনিয়ন পরিষদে ভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। আবার কিছু নির্বাচন পরবর্তী বছরেও গড়াতে পারে।
সিইসি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের বড় একটি অংশের বর্তমান মেয়াদ এ বছর শেষ হচ্ছে। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি কমিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই নির্বাচনের সময় নির্ধারণে বিভিন্ন বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আবহাওয়া, জাতীয় ও ধর্মীয় উৎসব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চাপ—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে ইসি।
সিইসি জানান, চলতি বছরের শেষ দিকে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সময় খুব বেশি হাতে নেই। বর্ষাকাল, বন্যার আশঙ্কা, দুর্গাপূজার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যস্ততা এবং বিভিন্ন পরীক্ষা শেষ করার বিষয় রয়েছে। এসব কারণে নির্বাচনের জন্য উপযোগী সময় নির্ধারণ করা হচ্ছে।
নভেম্বরের শেষ দিকে ভোট শুরু করা যায় কি না, সে বিষয়েও আলোচনা চলছে। এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে বিভিন্ন পরীক্ষা আগেভাগে শেষ করার অনুরোধ জানাতে পারে নির্বাচন কমিশন।
ইসি মনে করছে, শুষ্ক মৌসুমে ভোট আয়োজন করলে নির্বাচন পরিচালনা তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। বিশেষ করে দেশের দুর্গম ও পার্বত্য অঞ্চলে বর্ষাকালে যোগাযোগ ব্যবস্থা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই এসব অঞ্চলেও আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ভোটের সময় নির্ধারণ করতে চায় কমিশন।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাধারণত এক দিনে সম্পন্ন না করে কয়েকটি ধাপে আয়োজন করা হয়। সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনও সাত ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২১ সালের প্রথম ধাপে ৩৭১টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোট হয়েছিল।
এবারও ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। সিইসির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
তবে ভোটের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রতিকূল মৌসুমকে বেছে নিতে চায় না কমিশন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটারদের নির্বিঘ্ন চলাচল, ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের বিষয়টিও কমিশনের সামনে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই উপনির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনও থাকায় দুটি নির্বাচন যেন সাংগঠনিক বা প্রশাসনিকভাবে একে অপরের কাজে সমস্যা তৈরি না করে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
সিইসি জানিয়েছেন, নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো সরাসরি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। ফলে একাধিক বিষয় সমন্বয় করেই চূড়ান্ত সময়সূচি তৈরি করতে হবে।
ইসি জানিয়েছে, সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজন করা সম্ভব নয়। ইউনিয়ন পরিষদের পর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে।
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে রমজান শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর ঈদুল আজহা, গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল চলে আসবে। ফলে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে নির্বাচনের জন্যও সময়ের সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে চলতি বছরের শেষ থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা করছে কমিশন।
বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের প্রসঙ্গ তুলে সিইসি জানান, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আইন সংশোধন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সেবা আরও সহজ করার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন সিইসি। নাগরিকদের এনআইডি-সংক্রান্ত সেবা দ্রুত ও সহজে দেওয়ার পাশাপাশি জালিয়াতি ঠেকাতেও কমিশন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন প্রস্তুতি জোরদার করছে নির্বাচন কমিশন। সেপ্টেম্বরে তফসিল ঘোষণা সম্ভব হলে নভেম্বরের শেষ দিকে ভোট শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে চূড়ান্ত নির্বাচনী সময়সূচি নির্ভর করবে আইনগত বাধ্যবাধকতা, আবহাওয়া, পরীক্ষা, উৎসব এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতিসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.