পরিপূর্ণ সংস্কার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সরকার আংশিক সংস্কারের পথে এগোচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপন পর্বে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সংসদ থেকে বেরিয়ে যান বিরোধী দলের সদস্যরা।
সংসদে বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর আইনপ্রণয়ন কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিসহ চলমান সংস্কার কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যে মূলত পূর্ণাঙ্গ সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হওয়ায় তিনি সরকারের সমালোচনা করেন। তার বক্তব্যে সংস্কারের ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং জুলাই সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে আসে।
পরে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপনের জন্য নির্ধারিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না বলে জানান তিনি। এরপর বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ থেকে বেরিয়ে যান। রাত ৮টা ৬ মিনিটে তারা ওয়াকআউট করেন।
এই ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার পদ্ধতি নিয়েও বিরোধী দলের আপত্তি প্রকাশ্যে আসে। বিরোধী দলের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার নিশ্চিত না করে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন আইন পরিবর্তন বা নতুন আইন প্রণয়ন করা হলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর আইন হিসেবে অনুমোদনের বিষয়টিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওই সময়ে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে গত ১২ মার্চ এসব অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হয়। সেগুলোর অনুমোদন বা অননুমোদনের জন্য ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় নির্ধারিত ছিল।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে সেগুলো কার্যকারিতা হারায়। এছাড়া সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়।
যেসব অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল আকারে আনা হয়নি, তার মধ্যে গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধনসংক্রান্ত অধ্যাদেশও ছিল। এসব বিষয়ে আরও যাচাই-বাছাই করে নতুন করে বিল আনার কথা জানিয়েছিল সরকার। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশও এর আওতায় পড়ে।
অন্যদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ঘিরে আগের আইন ও অধ্যাদেশের বিষয়েও পরিবর্তন আনা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ রহিত করে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পুনঃপ্রচলনের জন্য বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনে একটি বিল পাস করা হয়েছিল। সে সময় সরকার জানিয়েছিল, আরও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশন আইনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এর ধারাবাহিকতায় গত ৩ আগস্ট গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। এরপর ১০ আগস্ট জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়াও অনুমোদন দেওয়া হয়। দুটি খসড়া অনুমোদনের পর থেকেই মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ ও আলোচনা শুরু হয়।
বিশেষ করে খসড়ার কয়েকটি ধারা ও বিধান নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং জোরপূর্বক গুমের মতো গুরুতর অপরাধের প্রতিকার নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনে পর্যাপ্ত ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার—দুটি বিষয়ই বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে এসব বিষয়ে নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রয়েছে।
বিরোধী দলের ওয়াকআউটের ফলে সংসদে চলমান আইন প্রণয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে—এসব প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংসদে বিরোধী দলের অবস্থান থেকে স্পষ্ট হয়েছে, তারা শুধু পৃথক পৃথক আইন সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের পরিবর্তে বৃহত্তর সংস্কার কাঠামোর সঙ্গে এসব উদ্যোগের সমন্বয় চায়। অন্যদিকে সরকার মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
এখন এসব খসড়া আইন নিয়ে সংসদে আরও আলোচনা, বিতর্ক ও যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধী দলের আপত্তি এবং বিভিন্ন মহলের উদ্বেগ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও আইন প্রণয়নের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে করা হবে, সেটিই আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সংসদীয় আলোচনায় বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.