আজ বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬। হিজরি ১৪৪৮ সনের ১২ রবিউল আউয়াল। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযোগ্য মর্যাদায় পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালন করছেন। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রকাশিত ইসলামি পর্বের তালিকা এবং সরকারি কর্মসূচি অনুযায়ী, এ বছর ১২ রবিউল আউয়াল পড়েছে ২৬ আগস্ট।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত দিন হিসেবে মুসলিমদের কাছে ১২ রবিউল আউয়াল বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামের শেষ নবী ও রাসুল হিসেবে তাঁর জীবন ও কর্ম মানবতার জন্য এক অনন্য আদর্শ হয়ে আছে।
মহানবী (সা.) এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আগমন করেন, যখন আরব সমাজে পৌত্তলিকতা, গোত্রীয় সংঘাত, কুসংস্কার, সামাজিক বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয় ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছিল। ইসলামের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে মানুষের সামনে তাওহিদ, ন্যায়, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও নৈতিকতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মা আমিনা বিনতে ওয়াহাব। জন্মের আগেই তিনি পিতাকে হারান। মাত্র ছয় বছর বয়সে মায়ের ইন্তেকালের পর তিনি এতিম হয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।
শৈশব থেকেই তাঁর সততা, বিশ্বস্ততা ও উন্নত চরিত্র মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত হিসেবে অভিহিত করত। তাঁর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ধৈর্য, ক্ষমা, বিনয় ও মানুষের প্রতি সহমর্মিতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
চল্লিশ বছর বয়সে মক্কার হেরা গুহায় তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নবুওয়াতের মহান দায়িত্ব। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান এবং অন্যায়, জুলুম, শোষণ, মিথ্যা, প্রতারণা ও বৈষম্য থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেন।
মক্কার জীবনে মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের কঠিন নির্যাতন ও নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়। এরপর আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় তিনি ধর্মীয় জীবনের পাশাপাশি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও দায়িত্বশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের বিষয়গুলো তিনি গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রায় ২৩ বছর নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেন। ৬৩ বছর বয়সে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর ওফাত মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর শোকের কারণ হয়ে আসে। তাঁর সাহাবিরা প্রিয় নবীকে হারানোর বেদনায় মুহ্যমান হয়ে পড়েন।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও সালাম পাঠ, দোয়া, নফল নামাজ, দান-খয়রাতসহ বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগিতে অংশ নেন। দেশের বিভিন্ন মসজিদ, ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের উদ্যোগে আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল, সিরাতুন্নবী মাহফিল ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এ উপলক্ষে সরকারও বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সরকারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশজুড়ে ধর্মীয় আলোচনা ও বিভিন্ন আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জাতীয় কর্মসূচির আলোকে যথাযথভাবে অনুষ্ঠান আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। তাঁদের বাণীতে মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। বঙ্গভবনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২৪ জুলাই ২০২৬ বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহার এবং শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধ, সংঘাত, অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে তাঁর শিক্ষা অনুসরণের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পক্ষকালব্যাপী সিরাতুন্নবী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকায় এ উপলক্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি এ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানমালায় মাহফিল, আলোচনা, সেমিনার, কবিতাপাঠ, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিযোগিতা, প্রকাশনা ও প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। বায়তুল মোকাররমের পূর্ব ও দক্ষিণ চত্বরে ইসলামি বইমেলারও আয়োজন করা হয়েছে।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) শুধু একটি স্মরণীয় দিন নয়—মুসলমানদের কাছে এটি মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। তাঁর সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব, অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও অনুসরণ করা যেতে পারে।
মহানবী (সা.)-এর দেখানো শান্তি, ন্যায়, দয়া ও মানবিকতার পথ অনুসরণের মধ্য দিয়ে সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হবে—এমন প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে আজ বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে পালিত হচ্ছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.