দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকদিন ধরে চলা সার সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। আমন মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। বিশেষ করে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সার নিয়ে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। এতে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারায় চলতি মৌসুমে আমন উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি মন্ত্রণালয় অবশ্য দেশে সারের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে বলে দাবি করছে। তাদের ভাষ্য, বর্তমানে সারের প্রকৃত সংকটের চেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি হয়েছে কৃত্রিম সংকট, অতিরিক্ত মজুত, অনিয়মিত হাতবদল এবং সংকটের গুজবের কারণে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসকদের মাঠপর্যায়ের তদারকি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটিও গঠন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
মাঠের চিত্র অবশ্য সরকারি দাবির সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা বলছেন, নির্ধারিত দামে ডিলারের কাছে গিয়েও প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও সার মিলছে না, আবার কোথাও বাড়তি অর্থ দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী সার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় টিএসপি ও ডিএপি সারের সংকটের অভিযোগ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। কৃষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ইউরিয়ার পাশাপাশি নন-ইউরিয়া সার ব্যবহার করলে জমির উর্বরতা ও উৎপাদন বাড়ে। সে কারণে আমন মৌসুমেও এসব সার কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন তারা। কিন্তু সরবরাহ কম থাকায় বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, আমন ও এর বীজতলার জন্য বর্তমান সময়ে ইউরিয়ার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। টিএসপি ও ডিএপির চাহিদা অন্য মৌসুমের তুলনায় তুলনামূলক কম থাকার কথা। কিন্তু কৃষকদের মধ্যে আগাম সার সংগ্রহের প্রবণতা তৈরি হওয়ায় বাজারে কিছু নন-ইউরিয়া সারের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি হওয়ায় সংকটের অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।
রংপুর অঞ্চলের কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সারের মজুত থাকার পরও কিছু ডিলারের অনিয়মের কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ায় অনেক কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় আগে থেকেই টিএসপি ও ডিএপি কিনে রাখতে চাইছেন। এতে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
লালমনিরহাট কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও সারের ভুল ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এনেছেন। তাদের মতে, বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত মাত্রা অনুযায়ী সার ব্যবহার করলে বর্তমান মজুত দিয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু কিছু এলাকায় কৃষকরা সুপারিশের বাইরে গিয়ে সার ব্যবহার করছেন। ধানের ক্ষেত্রে যেখানে ইউরিয়া টপ ড্রেসিং হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ রয়েছে, সেখানে কোথাও কোথাও ডিএপি ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এ ছাড়া সার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, কোনো কোনো কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার তুলে পরে অতিরিক্ত অংশ স্থানীয় দোকানে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে কয়েকজন ডিলারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কৃষি মন্ত্রণালয় মাঠ প্রশাসনকে আরও সক্রিয় করেছে। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় ডিলাররা চাহিদাপত্র দেওয়ার পরও সরকারি গুদাম থেকে সার না তোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের কথাও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সার বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিলারদের জন্যও নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্ধারিত দামের বাইরে সার বিক্রি করা যাবে না। গুদাম থেকে সার উত্তোলনের তথ্য সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তাকে জানাতে হবে এবং কৃষকের কাছে বিক্রির তথ্য রেজিস্টারে সংরক্ষণ করতে হবে। অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে ডিলারশিপ বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনও ডিলারদের নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রির নির্দেশ দিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কৃষকের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি ডিলারশিপ ব্যবস্থা সচল রাখতে সরকারি মূল্যের বাইরে সার বিক্রি বন্ধ করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সরবরাহ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
সরকারের দাবি, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার সারের মজুত পরিস্থিতি ভালো। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় টিএসপির মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইউরিয়ার মজুতও আগের বছরের তুলনায় বেশি রয়েছে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে সারের ঘাটতি নেই বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।
তবে কৃষক ও সার ব্যবসায়ীদের একাংশ এই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তাদের বক্তব্য, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্য উৎপাদন সম্প্রসারণ, ফল ও মাছ চাষে সারের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং একাধিক ফসল উৎপাদনের কারণে মাঠপর্যায়ে সারের চাহিদা আগের তুলনায় বেড়েছে। সেই অনুপাতে বরাদ্দ না বাড়লে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও স্থানীয় পর্যায়ে সংকট দেখা দিতে পারে।
সারের সংকট নিয়ে কয়েকটি এলাকায় উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে। কুড়িগ্রামের একটি ঘটনায় গুদাম ভাঙচুর ও সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় কিছু সার উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, সার সংকটের বিষয়টি শুধু সরবরাহের পরিমাণ দিয়ে বিচার করলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। সরকারি গুদাম থেকে ডিলার, ডিলার থেকে খুচরা পর্যায় এবং সেখান থেকে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষকদের সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করাও জরুরি।
কারণ আমন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদন মৌসুম। এই সময়ে জমিতে সময়মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ফলন কমে যেতে পারে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হলে খাদ্য চাহিদা পূরণে পরবর্তী সময়ে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের প্রত্যাশা, নজরদারি বাড়ানো এবং ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে সরকারি মজুত ও মাঠপর্যায়ের প্রাপ্যতার মধ্যে যে ব্যবধানের অভিযোগ উঠেছে, তা দ্রুত সমাধান করাই এখন আমন চাষিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.