ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় বহুল প্রতীক্ষিত রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় পর্যালোচনা করে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন উচ্চ আদালত।
বৃহস্পতিবার বেলা ১টার দিকে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম। এ মামলায় নিম্ন আদালতে ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও হাইকোর্টে দীর্ঘ শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনার পর দণ্ডের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া চার আসামি হলেন উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ এবং সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের।
অন্যদিকে, মামলার ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। তারা হলেন তৎকালীন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মণি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহিউদ্দিন শাকিল।
রায়কে কেন্দ্র করে নুসরাতের পরিবারের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরচন্দিয়া এলাকায় নুসরাতদের বাড়িতে অতিরিক্ত পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নুসরাতের মা শিরিন আক্তার আগে জানিয়েছিলেন, মেয়েকে হারানোর পরও তারা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উচ্চ আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেন নুসরাতের মা শিরীন আখতার। অভিযোগের পর পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে।
এরপর কারাগারে থাকা সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে তার অনুসারীদের যোগাযোগ ও আলোচনা হয়। মামলার তদন্তে উঠে আসে, নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল অধ্যক্ষকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ওই পরিস্থিতির মধ্যেই।
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে নুসরাতকে কৌশলে মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়।
আগুনে গুরুতর দগ্ধ নুসরাতকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আগের বার্ন ইউনিটে, তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল নুসরাত মারা যান।
ঘটনার পর দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। নুসরাত হত্যার দ্রুত বিচার দাবিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। মামলাটির বিচারও দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে ৮ এপ্রিল হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২৮ মে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরপর ২০ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।
মামলায় মোট ৮৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর আদালত রায়ের জন্য ২৪ অক্টোবর তারিখ নির্ধারণ করেন। মাত্র ৬১ কার্যদিবসে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়।
বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে আইন অনুযায়ী তা কার্যকর করার আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মামলার নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয়।
২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের সব নথি হাইকোর্টে পৌঁছে। এরপর মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করা হয় এবং শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চ নির্ধারণ করা হয়।
একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও নিজেদের দণ্ডের বিরুদ্ধে জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন। ফলে ডেথ রেফারেন্সের পাশাপাশি আসামিদের আপিলও হাইকোর্টে শুনানি হয়।
দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে হাইকোর্টের বেঞ্চ মামলার নথি, সাক্ষ্য ও অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করেন। এতে নিম্ন আদালতের রায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
হাইকোর্টের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়েছে এবং ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ফলে নুসরাত হত্যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলো।
নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত নারী নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাগুলোর একটি। উচ্চ আদালতের এই রায়ের পর এখন মামলার পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার দিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে নুসরাতের পরিবার ও স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.