দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিংয়ের মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে। এর আর্থিক মূল্য বছরে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। এসব যানবাহনে সাধারণত ১২ ভোল্টের চার থেকে পাঁচটি ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। একটি ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৯০০ থেকে ১১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। দিনে গড়ে আট ঘণ্টা চার্জ দেওয়া হলে একটি রিকশার জন্য প্রায় ৮ থেকে ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। সব রিকশা মিলিয়ে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৮০০ থেকে ৮৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে বলে সিপিডির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সিপিডির হিসাব অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জের পেছনে বছরে প্রায় ৩ লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ৫ শতাংশের সমান বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিপুল ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণই নয়, অবৈধভাবে চার্জ দেওয়ার কারণে সরকারের রাজস্ব হারানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অননুমোদিতভাবে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ায় বছরে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং ব্যবস্থাপনা নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের অনিয়ম। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা ৩ হাজার ৩০০। এর মধ্যে ডিপিডিসির আওতায় রয়েছে ২ হাজার ২০১টি বৈধ চার্জিং স্টেশন। তবে এসব বৈধ স্টেশনের তুলনায় অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা অনেক বেশি। কোথাও কোথাও বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সরাসরি সংযোগ নিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ঢাকায় অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের চিত্রও উদ্বেগজনক। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে রয়েছে ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৯৯২টি গ্যারেজ। এসব গ্যারেজে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রিকশা রাখা হয় এবং নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় সংকট তীব্র হয়েছে। চাহিদা ১৮ থেকে ১৯ হাজার মেগাওয়াটের বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। ফলে কয়েক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের মানুষকে কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাতেও সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং শুরু হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জের কারণে বিশেষ করে মধ্যরাতে বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে বাধার মুখে পড়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, অবৈধ অটোরিকশা দেশের মোট বিদ্যুতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে এসব যানবাহনের কারণে শহরে যানজট, দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত সমস্যাও বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। গবেষণায় অটোরিকশার সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্কের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
তবে অটোরিকশা শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ভিন্ন অবস্থানও রয়েছে। শ্রমিক নেতা খালেকুজ্জামান রিপন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা, পৃথক সার্ভিস রোড এবং চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। তার মতে, নীতিমালার আওতায় এনে নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ করা হলে সরকার রাজস্বও পেতে পারে এবং সড়কে শৃঙ্খলাও ফিরতে পারে।
এদিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ব্যাটারিচালিত ই-রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মাধ্যমে এসব ই-রিকশা নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। নিবন্ধনের অন্যতম শর্ত হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ থেকে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া অন্য উৎস থেকে চার্জ দিলে জরিমানার পাশাপাশি নিবন্ধন নবায়ন না করার বিধানও রাখা হতে পারে।
ঢাকায় ই-রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে আটটি জোন করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে চারটি করে জোন থাকবে। জোনভেদে আলাদা রং, নির্দিষ্ট সড়কে চলাচলের অনুমতি এবং জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা রয়েছে। নিবন্ধনের সময় প্রতিটি ই-রিকশায় কিউআর কোড দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের তীব্রতা বোঝা যায় সাম্প্রতিক লোডশেডিংয়ের পরিসংখ্যানেও। গত ১১ ও ১২ আগস্ট সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। ১১ আগস্ট রাত ১২টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৯৩১ মেগাওয়াট।
সব মিলিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিদ্যুৎ ব্যবহার এখন শুধু পরিবহন খাতের বিষয় নয়, বরং বিদ্যুৎ সরবরাহ, রাজস্ব, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। সরকার উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ই-রিকশার নিবন্ধন, চার্জিং ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে শৃঙ্খলা আনতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.