এলএনজি সরবরাহের সংকটের প্রভাব পড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্যাস ব্যবস্থায়। জেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি গত তিন দিন ধরে সব সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে সিএনজি চালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে কিছু যানবাহনে এলপিজি ব্যবহার করা হলেও এতে বেড়েছে পরিচালন ব্যয়। এর প্রভাব পড়েছে যাত্রীদের ভাড়াতেও।
স্থানীয় সূত্র ও ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাঁচটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গত বুধবার সকাল ১১টার পর থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে কয়েক দিন ধরে সরবরাহ সীমিত থাকায় স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম ছিল। পরিস্থিতির অবনতি হলে শেষ পর্যন্ত ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাসের প্রয়োজন হয়। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের পক্ষ থেকে পাঁচটি স্টেশনে দৈনিক প্রায় ৫০ হাজার ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ করা হতো। তবে সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এসব স্টেশনের মোট চাহিদা এর প্রায় দ্বিগুণ।
গ্যাস সংকট অবশ্য হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কম ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ পরিস্থিতিতে প্রায় ১৫ পিএসআই চাপে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে মাত্র ৩ থেকে ৪ পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছিল। ফলে পর্যাপ্ত গ্যাস নিতে না পারায় যানবাহন চালকদের ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
এরপর বুধবার থেকে সরবরাহ আরও কমে গেলে পরিস্থিতি সংকটজনক হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস পাওয়া একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জেলার সিএনজি চালিত যানবাহনের বড় একটি অংশ রাস্তায় নামতে পারছে না।
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কিছু অটোরিকশা চালক এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন। তবে এলপিজির অতিরিক্ত খরচের কারণে চালকদের পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কুমারশীল মোড় থেকে নন্দনপুর বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় যাতায়াতকারী এক যাত্রীর অভিজ্ঞতাতেও সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। মেহেদী নামে ওই যাত্রী জানান, একটি সিএনজি অটোরিকশার জন্য প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর গাড়ি পান। স্বাভাবিক সময়ে যে পথে ৪০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়, সেখানে চালক প্রথমে ৮০ টাকা দাবি করেন। পরে দরদাম করে ৭০ টাকায় যেতে সম্মত হন চালক।
চালকদের ভাষ্য, গ্যাস সংকটের কারণে আগের তুলনায় আয়-ব্যয়ের হিসাবও বদলে গেছে। জনি মিয়া নামে এক অটোরিকশা চালক জানান, তিনি কুমারশীল মোড় থেকে সরাইল-বিশ্বরোড মোড় রুটে গাড়ি চালান। এই রুটে সাধারণত ৫০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। গ্যাস সংকট শুরুর পর তিনি ৭০ টাকা ভাড়া নিচ্ছিলেন। কিন্তু এলপিজিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে জ্বালানি ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে প্রায় ৯০ টাকা ভাড়া নিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ফিলিং স্টেশন মালিক ও ব্যবস্থাপকদের কাছ থেকেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। ফাহাত ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক আমিনুল ইসলাম জানান, বুধবার থেকে স্টেশনটিতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। গ্যাস না থাকায় যানবাহনে সিএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে স্টেশনটির কার্যক্রমও বন্ধ রাখতে হয়েছে।
তাঁর দাবি, গ্যাস সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগামী রোববার অথবা সোমবার গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত হবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এদিকে গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে এলএনজি সরবরাহের ঘাটতির কথা জানিয়েছে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখার উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল হক জানান, এলএনজি সংকটের কারণে গ্রাহকদের নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, সংকট কখন পুরোপুরি কাটবে সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও নির্দিষ্ট সময়সীমা পাওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় শুধু সিএনজি চালিত যানবাহন নয়, আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকরাও সমস্যার মধ্যে পড়েছেন। বিশেষ করে রান্নার কাজে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে চাপ কমে যাওয়ার কারণে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সড়কে সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক গণপরিবহন ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়েছে। যেসব গাড়ি এলপিজিতে চলছে, সেগুলোর জ্বালানি ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় চালকরা বাড়তি ভাড়া দাবি করছেন। এতে সাধারণ যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াতের খরচও বাড়ছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে পরিস্থিতির সমাধান করা হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের কারণে যাতে গণপরিবহন ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।
বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেনি বাখরাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ। ফলে ফিলিং স্টেশনগুলো কবে আবার নিয়মিতভাবে চালু হবে এবং সিএনজি চালিত যানবাহন কবে স্বাভাবিক চলাচলে ফিরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.