চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় একটি মাদরাসার তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে সরকারি আমন ধানের ১৩ বস্তা বীজ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে উদ্ধার হওয়া এসব বীজ কৃষকদের বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি বিভাগ। ঘটনার পর মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত সুপারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের জামেউল উলুম মাদরাসায় এ ঘটনা ঘটে। উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মাদরাসাটিতে পরিদর্শনে গিয়ে একটি কক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। পরে কক্ষটি খুলে দেখতে পাওয়া যায় বিপুল পরিমাণ আমন ধানের বীজ। গণনা করে সেখানে মোট ১৩ বস্তা সরকারি বীজ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
উদ্ধার হওয়া বীজগুলো কৃষকদের মধ্যে বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য সরকারি কর্মসূচির আওতায় পাঠানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেগুলো বিতরণ না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া বীজগুলো প্রায় ২০ দিন আগে কৃষকদের মধ্যে বিতরণের উদ্দেশ্যে মাদরাসায় পাঠানো হয়েছিল। কৃষকদের কাছে বিতরণের পরিবর্তে সেগুলো কীভাবে মাদরাসার একটি তালাবদ্ধ কক্ষে সংরক্ষিত ছিল, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার শামসুল ইসলাম হেলালীকে ঘিরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তিনি একই সঙ্গে চরম্বা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। তবে সরকারি বীজ মজুত রাখার অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাজী শফিউল ইসলাম জানিয়েছেন, কৃষকদের বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য প্রায় ২০ দিন আগে দুজন প্রতিনিধির মাধ্যমে বীজগুলো পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো কেন এখনো কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়নি এবং কীভাবে একজন রাজনৈতিক নেতার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানে বীজগুলো অবস্থান করছিল, সেটি তদন্ত করে দেখা হবে।
কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা আরও জানান, সরকারি কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের জন্য পাঠানো বীজ নির্ধারিত সময়ে বিতরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমন মৌসুমে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী বীজ সরবরাহ করা না হলে চাষাবাদে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ কারণে বিষয়টির প্রশাসনিক দিকও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার বিষয়ে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বায়েজিদ-বিন-আকন্দ জানিয়েছেন, মাদরাসা পরিদর্শনের সময় তালাবদ্ধ কক্ষটি নজরে আসে। পরে নির্দেশ দেওয়ার পর কক্ষটি খুলে সেখানে ১৩ বস্তা আমন ধানের বীজ পাওয়া যায়। উদ্ধারের পর বীজগুলো কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, মাদরাসার সুপারকে ইতোমধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তদন্তে সরকারি বীজ মজুত রাখার বিষয়ে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকদের জন্য সরকারি প্রণোদনা ও বিনা মূল্যের বীজ বিতরণ কর্মসূচি কৃষি উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে আমন মৌসুমে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে উন্নত জাতের বীজ সরবরাহের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ফলন বাড়ানোর লক্ষ্য থাকে। তাই বরাদ্দ করা বীজ যথাসময়ে প্রকৃত কৃষকদের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
লোহাগাড়ায় সরকারি আমন ধানের বীজ উদ্ধারের ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—কৃষকদের মধ্যে বিতরণের জন্য পাঠানো বীজ নির্ধারিত সময়ে কেন বিতরণ করা হয়নি এবং কী কারণে সেগুলো একটি তালাবদ্ধ কক্ষে রাখা হয়েছিল। উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ বিষয়টি তদন্ত করে দেখার কথা জানিয়েছে।
এদিকে উদ্ধার করা বীজ কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বীজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম হয়েছে কি না, সেটি তদন্তের পরই পরিষ্কার হবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব পাওয়ার পর ঘটনার পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে। ফলে তদন্ত শেষে এ ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.