ঢাকা: সময়ের স্রোতে রাজপথের গুলির আওয়াজ স্তব্ধ হয়েছে, বদলে গেছে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট। তবে বদলায়নি জুলাই বিপ্লবে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর করুণ বাস্তবতা। ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে জীবন উৎসর্গকারী পাঁচ সাংবাদিকের হত্যাকাণ্ডের বিচারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতির মুখ দেখেনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। উল্টো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়া, আসামি ধরে ছেড়ে দেওয়া এবং সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন শহীদ সাংবাদিকদের স্বজনরা।
২০২৪ সালের রক্তাক্ত জুলাই-আগস্টে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকার ও তাদের সহযোগী সন্ত্রাসী বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন পাঁচজন সাহসী গণমাধ্যমকর্মী। এই সময়ে আহত হন আরও তিন শতাধিক সাংবাদিক। জীবন উৎসর্গকারী এই পাঁচ বীর সাংবাদিক হলেন—শাকিল হোসেন পারভেজ, হাসান মেহেদী, তাহির জামান প্রিয়, এটিএম তুরাব এবং সোহেল আখঞ্জি।
উত্তরায় সংবাদ সংগ্রহের সময় ১৮ জুলাই গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক শাকিল হোসেন পারভেজ। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তাঁর বাবা বেলায়েত হোসেন এখনো খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রহর গুনছেন। তিনি প্রকাশ্যে মূল নির্দেশদাতাদের সাজা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
একই দিনে যাত্রাবাড়ীতে দায়িত্ব পালনের সময় এপিসির গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান ঢাকা টাইমসের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হাসান মেহেদী। দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন তাঁর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়েরের পরও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, অভিযুক্তরা ঘুরে বেড়ালেও তাঁদেরকে প্রতিদিন হুমকির মুখে দিন কাটাতে হচ্ছে।
সায়েন্স ল্যাব এলাকায় আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ১৯ জুলাই প্রাণ হারান তাহির জামান প্রিয়। তাঁর বৃদ্ধা মা শামসী আরা জামান কেবল মাঠপর্যায়ের হত্যাকারী নয়, বরং যারা হত্যার নির্দেশ দিয়ে রূপায়ণ করেছেন তাদের সবার ফাঁসি চান। একই দিনে সিলেটে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান এটিএম তুরাব। বিয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় তাঁর এই অকাল প্রয়াণে পরিবারে নেমে আসে চিরস্থায়ী অন্ধকার।
অন্যদিকে, ৫ আগস্ট হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে ভিডিও ধারণের সময় নির্মমভাবে খুন হন দৈনিক লোকালয়ের স্টাফ রিপোর্টার সোহেল আখঞ্জি। তাঁর স্ত্রী মৌসুমী আক্তারের অভিযোগ, তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সামনে এই হত্যাকাণ্ড ঘটলেও আসামিদের ধরে পরবর্তীতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত প্রক্রিয়ার ধীরগতি, মূল আসামিদের অধরা থাকা এবং বিচারে অগ্রগতির অভাব শহীদ পরিবারগুলোকে গভীরভাবে হতাশ করেছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও বৃদ্ধ অভিভাবকদের শেষ বয়সের একটাই আকুতি—অবিলম্বে তদন্ত ত্বরান্বিত করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা হোক।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.