ইসলামাবাদ: দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তি নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এবার সরাসরি রাজনীতির মাঠে না হলেও, শারীরিক অসুস্থতা ও স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তাঁকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার জোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গোটা বিষয়টি অত্যন্ত রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হওয়ায় প্রকাশ্যে কিছু না বলা হলেও, নেপথ্যে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
পাকিস্তানের অত্যন্ত প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ও ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অবজারভার’-কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
পাকিস্তানের চলমান দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটাতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আলোচনায় যুক্ত একটি সূত্রের দাবি, "দেশকে স্বাভাবিক ধারায় ফেরাতে হলে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকটের অবসান ঘটানো ছাড়া বিকল্প নেই। বছরের পর বছর চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা পাকিস্তানের অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছে।"
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে বিতর্কিত একটি দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তারের পর থেকে দীর্ঘ তিন বছর ধরে আদিয়ালা কারাগারে বন্দি আছেন ৭৩ বছর বয়সী এই ক্রিকেট তারকা থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া নেতা। গ্রেপ্তারের পর থেকেই তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। পিটিআই সমর্থকদের অভিযোগ, দুর্নীতির মামলা কেবল একটি অজুহাত মাত্র; মূলত সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিরোধের জেরেই তাঁকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার কৌশল হিসেবে জেলে পাঠানো হয়েছে।
গত কয়েক মাস ধরে ইমরান খানের সঙ্গে তাঁর পরিবার, বোন বা আইনজীবীদের কোনো দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর গুজব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যে থাকা ইমরান খানের দুই ছেলে সুলায়মান খান ও কাসিম খান এক বিবৃতিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা জানান, দীর্ঘ দিন ধরে বাইরের বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখার কারণে তাঁদের বাবার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়েছে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। অন্যদিকে, ইমরান খানের আন্তর্জাতিক সংবাদ বিষয়ক উপদেষ্টা সাইয়েদ জুলফি বুখারি দ্রুত মানবিক কারণে তাঁর উন্নত চিকিৎসা ও মুক্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।
আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী কারাগার থেকে সহজে বের হতে ‘স্বাস্থ্যগত কারণ’ সবচেয়ে বড় ভিত্তি হতে পারে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ইমরান খানের চোখে একটি অস্ত্রোপচার হয়েছিল এবং বর্তমানে তিনি একাকী বন্দিদশায় রয়েছেন।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন সমঝোতার নজির নতুন নয়। এর আগে ২০১৯ সালে একইভাবে সেনাকর্তাদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে লন্ডনে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। গুঞ্জন রয়েছে, ইমরান খানের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো ‘নওয়াজ মডেল’ সাজানো হচ্ছে। তবে সে ক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে থাকতে পারে—দেশ ত্যাগ করা, রাজনীতি থেকে একদম নিষ্ক্রিয় থাকা এবং জনসমক্ষে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য না দেওয়া।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—১৯৯২ সালের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক এই কঠোর শর্ত মেনে মুক্ত হবেন কি না। ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী ক্লাইভ স্টাফোর্ড স্মিথ মনে করেন, ইমরান চরিত্রগতভাবেই অত্যন্ত জেদি ও নীতিবান।
স্মিথ বলেন, "খেলার মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্রুতগতির বোলারদের সামনেও যিনি হেলমেট ছাড়া নামতে দ্বিধা করেননি, তিনি হয়তো রাজনৈতিক জীবন জলাঞ্জলি দিয়ে মুক্তি মেনে নেবেন না। তবে ব্যক্তিগত বন্ধু হিসেবে আমি চাই তিনি অন্তত বেঁচে থাকার স্বার্থে এই সমঝোতা মেনে নিন।"
এখন পাকিস্তান সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং ইমরান খানের ব্যক্তিগত পদক্ষেপ কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.