ঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল এবং মাস্টারদা সূর্য সেন হলে সম্প্রতি সমকামিতার অভিযোগ কেন্দ্র করে তীব্র আলোচনা, সমালোচনা ও রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ঘটনা, প্রশাসনিক তৎপরতা, কারণ দর্শানো এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাতের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিধিমালায় এ সংক্রান্ত কী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে প্রণীত ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ’ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালিত হলেও এই আইন বা হলসংক্রান্ত বিধিতে ‘সমকামিতা’ শব্দটি আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়নি এবং এর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো শাস্তির বিধানও রাখা হয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের চিন্তাভাবনা শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত ৩০ জুলাই মাস্টারদা সূর্য সেন হলে। হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী সমকামী কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে বহিরাগত একজনকে রুমে আনেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাঁদের হাতেনাতে ধরে হল প্রশাসন ও শাহবাগ থানায় সোপর্দ করেন। এই ঘটনার জেরে ওই শিক্ষার্থীর হলের আসন বাতিল করে তাঁকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়। প্রাধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম জানান, সমকামী ঘটনাকে তারা ‘নৈতিক স্খলন’ হিসেবে বিবেচনা করে প্রাধ্যক্ষের ক্ষমতা বলে এই শাস্তি দিয়েছেন।
এর পরপরই ১ আগস্ট ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে দ্বিতীয় ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। হলের শাখা ছাত্রশিবির নেতা ও এজিএস ইব্রাহীম খলিলের কক্ষে অবস্থান করা দুই অতিথির সমকামী কর্মকাণ্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাঁরা অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চান। এ ঘটনায় এজিএস ইব্রাহীমের আসন সাময়িকভাবে বাতিল করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে ইব্রাহীমের দাবি, তাঁর অজ্ঞাতে এই ঘটনা ঘটেছে। এই তদন্ত চলাকালেই রোববার প্রাধ্যক্ষের কক্ষে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে মারামারি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রের খবর, এ ধরনের সংবেদনশীল সমস্যা আগে কখনো এমন বড় আকারে দেখা না দেওয়ায় প্রশাসনিক বিধিতে আলাদা কোনো ধারার প্রয়োজন পড়েনি। বর্তমানে অসদাচরণ, শৃঙ্খলাভঙ্গ, পরিবেশ বিনষ্ট কিংবা হলের নিয়ম লঙ্ঘনের প্রশাসনিক ধারায় সতর্কীকরণ, আসন বাতিল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কারের এখতিয়ার প্রশাসনের রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জাতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী, প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যেকোনো যৌন আচরণ রাষ্ট্রীয় আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ, যার ফয়সালা হয় বিচারিক আদালতে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই ধরনের নির্দিষ্ট অভিযোগের বিচারের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা প্রকট হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানিয়েছেন, শিগগিরই একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করার কথা ভাবছে প্রশাসন।
উপাচার্য স্পষ্ট করেন, "সমকামিতার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বিধিতে আলাদা লিখিত কোনো শাস্তির বিধান নেই। আপাতত বিষয়গুলো হলের সাধারণ শৃঙ্খলা ও অসদাচরণের কাঠামোর মধ্যে রেখে সমাধান করা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে এই ধরনের অভিযোগ মোকাবিলায় একটি স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।"
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.