ঢাকা: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন এক নতুন সূর্যোদয় এনে দিয়েছে, তেমনই এর নেপথ্যে রয়ে গেছে বহু তাজা প্রাণের রক্ত আর বিভীষিকাময় আত্মত্যাগের করুণ গল্প। রাজপথে স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটাতে গিয়ে বুলেটের আঘাতে শত শত তরুণ ও সাধারণ মানুষের চোখের আলো চিরতরে নিভে গেছে।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বলছে, ১৭ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সহিংসতায় অন্তত ৫৩৭ জন তাদের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ বা আংশিক হারিয়েছেন। এর মধ্যে ৪৪ জন তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তি তাদের দুই চোখের আলোই পুরোপুরি হারিয়েছেন, আর ৪৯৩ জন বেঁচে আছেন কেবল এক চোখের দৃষ্টি সম্বল করে।
চোখের আলো হারানো এই ৪৪ জনের সামাজিক ও পেশাগত পরিচয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এদের বেশিরভাগই ছিলেন পরিবারের প্রধান বা একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। এই তালিকায় রয়েছেন:
১৩ জন শিক্ষার্থী
৫ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী
৪ জন পেশাদার গাড়িচালক
৪ জন বেসরকারি চাকরিজীবী
২ জন শ্রমজীবী মানুষ
১ জন গৃহিণী
১৫ জন সাধারণ নাগরিক (যাদের তাৎক্ষণিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি)
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আক্রান্তদের সিংহভাগই ১৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ। অনেক আহতের মাথায় ও চোখের ভেতরের রক্তনালীতে এখনো সেভেন পয়েন্ট সিক্সটি টু (7.62) কিংবা ক্ষতিকর ছররা গুলির অংশ রয়ে গেছে, যা প্রতিনিয়ত তাদের শারীরিক যন্ত্রণাকে বাড়িয়ে তুলছে।
৪ আগস্ট কারওয়ান বাজারের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন সাধারণ তরুণ সাব্বির আহমাদ। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ভেবে লাশের সারিতে ফেলে রাখা হয়েছিল। অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও তিনি হারিয়েছেন দুই চোখের আলো।
নিজের আড়াই মাস বয়সী একমাত্র সন্তানকে কোনোদিন চোখে দেখতে পাননি সাব্বির। শুধু হাত দিয়ে স্পর্শ করে সন্তানকে অনুভব করেন। গভীর বেদনায় তিনি জানান, স্বপ্নে এখনো নিজেকে পাহাড় ও প্রকৃতির সবুজ ঘাসে হেঁটে বেড়াতে দেখেন, কিন্তু ঘুম ভাঙলেই নেমে আসে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "আমরা কারো কাছে দয়া বা হাত পাততে চাই না। আমাদের মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় খাতে চাকরির ব্যবস্থা করা হোক, যাতে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে পারি।"
আরেক দৃষ্টিহারা যোদ্ধা বাড্ডার দুর্জয় আহমেদ। যে বুলেটে তার চোখ বিদীর্ণ হয়, সেটি আরো দুজনের শরীর ভেদ করে তার মাথার ভেতরে আটকে যায়। অস্ত্রোপচারের পরও সেটি বের করা সম্ভব হয়নি।
একইভাবে ৫ আগস্ট মিরপুরে আহত চালক মিজানুর রহমান বা মোহাম্মদপুরের গৃহিণী নিলু পারভিনের সংসার এখন ঘোর অনিশ্চয়তায়। একসময় স্বাবলম্বী থাকা এসব মানুষ এখন সরকারি ভাতা দিয়ে সংসার ও চিকিৎসার চড়া খরচ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকের মনেই এখন চরম ক্ষোভ—রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনে যে পরিমাণ তৎপরতা থাকা দরকার ছিল, তা এখনো দৃশ্যমান নয়।
আন্দোলন চলাকালীন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালের রেটিনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা জানান, আন্দোলনের ওই দিনগুলোতে প্রায় ৮৬৪ জন রোগী সরাসরি চোখে গুরুতর আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জরুরি বিভাগে চারদিকে শুধু রক্তাক্ত তরুণদের চিৎকার ও স্বজনদের কান্না শোনা যেত।
আইনি জটিলতা ও তৎকালীন পুলিশি হয়রানির ভয়ে অনেক রোগী ও তাদের পরিবার ভুল নাম-ঠিকানা দিয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন, যার কারণে পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরিতেও শুরুতে বেগ পেতে হয়েছে।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) কামাল আকবর জানান, ফ্যাসিবাদের বুলেটে চোখ হারানো প্রতিটি মানুষকে পুনর্বাসিত করা এবং তাদের রাষ্ট্রীয় সম্মানের জায়গায় অধিষ্ঠিত করাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ।
দৃষ্টি হারানো এই যোদ্ধারা কেবল আর্থিক সহায়তাই চান না, তারা চান ‘জুলাই সনদ’-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন। স্বৈরাচারমুক্ত যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে তারা নিজেদের জীবন ও চোখের আলো বিসর্জন দিয়েছেন, সেই নতুন বাংলাদেশে যেন কোনো বৈষম্য না থাকে—এটাই এখন তাদের একমাত্র প্রত্যাশা।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.