রাজধানী ঢাকা: বিগত সরকারের সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক হয়ে ওঠা গোপন বন্দিশালা বা তথাকথিত ‘আয়নাঘর’ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারকমণ্ডলী। শনিবার সকালে রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত র্যাব-১-এর অভ্যন্তরীণ টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে এই পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিগত দিনে সেখানে বন্দিদের ওপর চালানো নির্মম নির্যাতনের বাস্তব চিত্র ও স্থানিক প্রমান সরাসরি আদালতের সামনে তুলে ধরতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
শনিবার বেলা ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারক দল উত্তরায় র্যাব-১ কার্যালয়ে পৌঁছান। প্রতিনিধিদলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। বিচারকদের সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদসহ প্রসিকিউশন টিমের অন্যান্য সদস্য এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘ সময় ধরে গোপন বন্দিশালাটি ঘুরে দেখার পর দুপুর ১২টার দিকে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। পরিদর্শনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বিগত দিনগুলোতে এই টিএফআই সেলে নাগরিকদের বেআইনিভাবে আটকে রেখে যে অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তার বাস্তবতা অনুধাবন করতেই বিচারকদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সরাসরি পরিদর্শন ও প্রাপ্ত আলামত ট্রাইব্যুনালের মেমোরেন্ডাম বা স্মারকের অংশ হিসেবে বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একই সঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর এক কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর এই গোপন বন্দিশালার অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলতে কিংবা আলামত নষ্ট করতে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের কাউকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধের প্রমাণ গোপনের চেষ্টাও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর তদন্ত সূত্রে পাওয়া এক চাঞ্চল্যকর তথ্যের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদকে ভারতে পাচার করে দেওয়ার আগে এই উত্তরার গোপন টিএফআই সেলেই একটি নির্দিষ্ট সময় আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়েছিল, যা ইতোমধ্যে তদন্তে উঠে এসেছে।
সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় বিচারকমণ্ডলী বন্দিশালার আয়তন, আলোর অভাব, বাতাসের সংকটের স্থানগুলো খতিয়ে দেখেন এবং পূর্বের বন্দিদের দেওয়া বর্ণনার সাথে বাস্তবের মিল মিলিয়ে নেন। একই সাথে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে এই কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সরাসরি অপরাধের স্থান পরিদর্শন বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের চলমান বিচারপ্রক্রিয়া আরও গতিশীল, বাস্তবসম্মত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.