রাজধানী ঢাকা: চালের বাজারে বছরের পর বছর ধরে ‘মিনিকেট’ ও ‘নাজিরশাইল’ নামে যে চাল সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে, তার বড় অংশই আসলে অন্য জাতের ধান থেকে তৈরি নকল ব্র্যান্ডিং। কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, সরকারি নথিতে বা গবেষণায় ‘মিনিকেট’ নামে কোনো নিবন্ধিত বা স্বীকৃত ধানের জাতের অস্তিত্বই নেই। অথচ অধিক মুনাফার লোভে অতিমাত্রায় চাল পলিশ করে সাধারণ ভোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে এই চকচকে চাল, যা পুষ্টিগুণ ধ্বংস করার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে বিপুল অপচয়ের সৃষ্টি করছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, মূলত ২০১৪-১৫ সালের দিকে যশোর-কুষ্টিয়া সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত এলাকা থেকে কৃষকদের মাঝে বিতৃত ‘মিনি কিট’ (Mini Kit) নামক বীজ সহায়তা থেকেই শব্দটির উৎপত্তি। সেখান থেকে ব্যবসায়ীরা এক ধরণের বাণিজ্যিক কৌশল হিসেবে ‘মিনিকেট’ নামটি ব্যবহার শুরু করেন। বাস্তবে ব্রি ধান-২৮, ব্রি ধান-২৯ বা ভারতীয় সরু ধানকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত পলিশ বা ছাঁটাই করে বাজারে ‘মিনিকেট’ হিসেবে চড়া দামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে ব্রি ধান-৪৯ কে নাজিরশাইল বলে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ আইন অনুযায়ী চালে ৫ থেকে ৭ শতাংশের বেশি পলিশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কৃষিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, এই অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত পলিশের কারণে দেশে উৎপাদিত মোট ৪ কোটি টনেরও বেশি চালের প্রায় ১০ শতাংশই কুঁড়ায় পরিণত হয়ে অপচয় হচ্ছে।
ভোক্তাদের এই প্রতারণা থেকে রক্ষা করতে ২০২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি খাদ্য মন্ত্রণালয় একটি যুগান্তকারী পরিপত্র জারি করে। পরিপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়—চালের প্রতিটি বস্তায় উৎপাদনকারী মিলের নাম, উপজেলা ও জেলা, উৎপাদনের তারিখ, মিলগেট মূল্য এবং ধানের প্রকৃত জাত লেখা বাধ্যতামূলক। একই জাতের ধান থেকে তৈরি চাল বাজারে ভিন্ন ভিন্ন নামে ও দামে বিক্রি বন্ধ করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তবে বাস্তবচিত্র ভিন্ন। অভিযোগ উঠেছে, চালকল মালিকদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও তৎকালীন খাদ্য মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে প্রজ্ঞাপনটি বাস্তবায়ন না করে পুরোপুরি ফাইলবন্দী করে রাখা হয়। কৃষি বিভাগ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রধান প্রধান চাল উৎপাদনকারী অঞ্চল—যেমন নওগাঁ, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর ও শেরপুরের মিল মালিকদের কাছ থেকে আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে মন্ত্রীকে ‘ম্যানেজ’ করা হয়। এর ফলে চালের বস্তায় জাত ও দাম লেখার নির্দেশনা সরকারি নথিতেই আটকে যায়।
অবশ্য মিল মালিকদের একাংশ এই অনিয়ম অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, মাঠপর্যায়ে কৃষকরা সরাসরি চিকন ধানের আবাদ করছেন এবং সেগুলো প্রসেস করেই বাজারে সরবরাহ করা হয়। প্রজ্ঞাপন আটকে দেওয়ার অনৈতিক লেনদেনের বিষয়টিও তারা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, প্রযুক্তিগত গবেষণা ও চালের আসল বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর মতে—বাজারে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ মিনিকেট চাল বিক্রি হয়, তার কোনো বাস্তব বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বিক্রেতারা বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। সরকারি পর্যায়ে পরিপত্রটি অবিলম্বে পুনরায় কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি তুলেছেন কৃষিবিদ ও সচেতন নাগরিকরা।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.