সংযুক্ত আরব আমিরাতের কারাগারে প্রায় দেড় মাস ধরে বন্দি থাকা বিতর্কিত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউএই সরকার। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মুখপাত্র মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে সম্প্রতি দুবাইয়ের একটি শপিংমল থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে স্থানীয় পুলিশ।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের কাছে প্রয়োজনীয় আইনি ও কারিগরি নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। মামলার নথিপত্র, পরোয়ানা এবং প্রাথমিক সাক্ষ্যপ্রমাণ দুবাই পুলিশের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দিনরাত কাজ করছেন দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, তথ্য গোপন ও পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ অন্তত অর্ধ ডজন মামলা রয়েছে। ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারের পর প্রথম দফায় ১৪৪ পৃষ্ঠার আরবি ও ইংরেজি ভাষার নথিপত্র দুবাইয়ে পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে দুবাই পুলিশের চাহিদা অনুযায়ী দ্বিতীয় দফায় অতিরিক্ত তথ্য-উপাত্ত পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সংগৃহীত নথিপত্রগুলো দ্রুতই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। সেখান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইন্টারপোলের মাধ্যমে তা ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাবে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দু'দেশের মধ্যে সরাসরি বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও আন্তর্জাতিক নিয়ম ও পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তির আওতায় সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তাকে ফেরত আনা সম্ভব।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত সুপ্রিম কোর্টের একাধিক আইনজীবী জানান, কোনো আসামিকে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দেশটির আদালত মূলত চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়: ১. উত্থাপিত অপরাধের উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র। ২. উভয় দেশের আইনে 해당 কাজটিকে 'অপরাধ' হিসেবে গণ্য করা হয় কিনা। ৩. মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কিনা তা যাচাই। ৪. উভয় দেশের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতার মান।
সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, প্রক্রিয়াটি কেবল আইনি লড়াইয়ের ওপর নির্ভর করছে না, কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমেই এটির দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জাতিসংঘ সনদ এবং বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তির আলোকেও আসামি হস্তান্তর সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত।
বেনজীর আহমেদকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা বা চ্যালেঞ্জ হতে পারে তাঁর সম্ভাব্য বিদেশি নাগরিকত্ব। বিভিন্ন সূত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, তিনি বিনিয়োগের বিনিময়ে তুরস্কের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট লাভ করেছেন এবং দুবাইয়েও তাঁর ব্যবসা ও রেসিডেন্ট পারমিট রয়েছে।
আইনি বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, আসামি যদি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব দাবি করেন বা দুবাইয়ের আইনগত বাসিন্দা হিসেবে নিজ দেশে না ফেরার যুক্তি তুলে ধরেন, তবে আদালতীয় প্রক্রিয়া কিছুটা দীর্ঘায়িত হতে পারে। অতীতে একই ধরনের জটিলতার কারণে কিছু হাই-প্রোফাইল অপরাধীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি, যদিও নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর একাধিক চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার আসামিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেই সফলভাবে ফিরিয়ে এনেছে বাংলাদেশ পুলিশ।
দুদক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, নথিপত্র প্রদান ও বিচারিক পর্যালোচনা মাত্র শুরু হয়েছে। দুবাইয়ের আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি শোনার পরই চূড়ান্ত আদেশ দেবেন। ফলে সাবেক এই প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.