অনলাইন ডেস্ক: আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং ইউরোপীয় ফুটবলের অভিভাবক উয়েফার মধ্যকার দ্বন্দ্ব এখন তুঙ্গে। ফিফার টুর্নামেন্টগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আগামী বিশ্বকাপ বর্জনের মতো চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপের ফুটবল সংস্থাগুলো। ফুটবলের ঐতিহ্য ও প্রশাসনিক মৌলিক কাঠামোর বাণিজ্যিকীকরণ ঠেকাতেই বিশ্বমঞ্চ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার এই ঘোষণা দিয়েছে তারা।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি ও দ্য অ্যাথলেটিক-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার উয়েফার অন্তর্ভুক্ত ৫৫টি সদস্য দেশের অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের নিয়ে এক জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ফিফা যদি তাদের বিতর্কিত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থেকে পিছু না হটে, তবে ইউরোপের দেশগুলো আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপ বর্জনে বাধ্য হবে।
এই নতুন বৈশ্বিক সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি নতুন প্রস্তাব। সম্প্রতি তিনি 'ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ' (FFE) নামে নতুন একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা পেশ করেন। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্ব ফুটবলের সবকটি টুর্নামেন্ট পরিচালনা এবং মিডিয়া ও স্পন্সরশিপ স্বত্বকে একটি একক বাণিজ্যিক কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক এই উদ্যোগের আনুমানিক বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। ফিফা চাচ্ছে এই নতুন প্রতিষ্ঠানের একটি নির্দিষ্ট অংশের শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারী বা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মের কাছে হস্তান্তর করে বাজার থেকে ৪২০ কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহ করতে। জানা গেছে, ইতোমধ্যেই জশুয়া কুশনায়েরের মালিকানাধীন প্রভাবশালী বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘থ্রাইভ ইটারনাল’ এই শেয়ার কেনার বিষয়ে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে।
উয়েফা এবং ইউরোপীয় ক্লাবগুলো শুরু থেকেই ফিফার এই শেয়ার বিক্রি প্রকল্পের চরম বিরোধিতা করে আসছিল। ইউরোপীয় ফুটবল বোদ্ধাদের যুক্তি, ব্যক্তিগত পুঁজি ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অনুপ্রবেশ ঘটলে ফুটবল তার মূল ভাবমূর্তি ও স্বাধীনতা হারাবে। উয়েফা মনে করে, ফুটবলের ঐতিহ্য, নিয়ম-কানুন ও আন্তর্জাতিক আসরগুলো কেবল প্রাতিষ্ঠানিক লভ্যাংশের জন্য বিক্রির বস্তু হতে পারে না।
বৃহস্পতিবারের সভায় সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা একমত হন যে, ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের বাণিজ্যিক স্বার্থ যখন টুর্নামেন্ট পরিচালনায় জড়িয়ে পড়বে, তখন সাধারণ ভক্ত ও দেশগুলোর ভাবাবেগ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই ইউরোপের দেশগুলো ফিফার এই বাণিজ্য কৌশলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গিয়ে বিশ্বকাপ বয়কটের পক্ষে ভোট দেয়।
উয়েফার এই ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত যদি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বিশ্ব ফুটবলের সূচিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে। সূচি অনুযায়ী, আগামী গ্রীষ্মে ব্রাজিলের মাটিতে পর্দা ওঠার কথা রয়েছে ‘ফিফা নারী বিশ্বকাপ’-এর। এর পরপরই ২০৩০ সালে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা পুরুষদের বহুল কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ।
উয়েফার বয়কট কার্যকর হলে এই দুটি ঐতিহ্যবাহী বিশ্বমঞ্চেই ইউরোপের পরাশক্তি দলগুলোকে দেখা যাবে না। স্পেন বা পর্তুগালের মতো স্বাগতিক দেশগুলো যদি তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক সংস্থার সিদ্ধান্ত মেনে টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে ২০৩০ বিশ্বকাপের আয়োজন বড় ধরনের আইনগত ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়বে।
যদিও ফিফার প্রস্তাবিত এই রূপরেখা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ফুটবলের সব সদস্য দেশের সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি, তবুও উয়েফার এই সিদ্ধান্ত ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতিনির্ধারকদের ওপর এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
ইউরোপীয় ফুটবলের বিশাল দর্শকপ্রিয়তা এবং বড় বড় স্পন্সরশিপের অধিকাংশ অংশই এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে উয়েফা ছাড়া কোনো বিশ্বকাপ আয়োজন ফিফার জন্য অর্থনৈতিকভাবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও অকার্যকর হয়ে উঠবে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই মহাসংকট কাটাতে জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেন, নাকি বিশ্ব ফুটবল এক নজিরবিহীন বিভক্তির দিকে এগিয়ে যায়।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.