সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদকে কেন্দ্র করে একটি আপত্তিকর ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভাইরাল হওয়া এই কনটেন্টকে কেন্দ্র করে নেটদুনিয়ায় তীব্র পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
ঘটনার পরপরই প্রতিমন্ত্রী বিষয়টিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিকভাবে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন। তবে সরকারের একজন মন্ত্রীর পদমর্যাদার ব্যক্তির নাম জড়িয়ে এমন কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ায় এবং পরবর্তীতে নিরপেক্ষ ফ্যাক্টচেক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে বিষয়টি আরও জটিল রূপ নিয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ সামাজিক মাধ্যমে তার প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন, ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে। তাকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতেই একটি বিশেষ মহল এই ভুয়া কনটেন্ট ছড়িয়েছে বলে তিনি জানান। ঢাকার একাধিক গণমাধ্যমেও মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যেখানে কনটেন্টটি এআই-নির্মিত বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিমন্ত্রীর নিজ এলাকা পঞ্চগড় ও দেবীগঞ্জ-বোদা অঞ্চলে এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বুধবার রাতে পঞ্চগড় জেলা ও পৌর বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, প্রতিমন্ত্রী যখন তার কাজের মাধ্যমে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করছেন, ঠিক তখনই বিরোধী রাজনৈতিক একটি চক্র (শিবিরের মিডিয়া সেল) তার বিরুদ্ধে এই ষড়যুদ্ধে নেমেছে। বিএনপি নেতারা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থার দাবি জানান এবং বিক্ষোভ মিছিল করেন।
এদিকে, প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের 'এআই কারসাজি'র দাবির পরদিনই ২৯ জুলাই ফ্যাক্টচেকিং পোর্টাল 'দ্য ডিসেন্ট' একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংবাদমাধ্যমে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একাধিক ছবি, প্রায় ২০ সেকেন্ডের একটি শব্দহীন ভিডিও এবং হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার স্ক্রিনশট সংগ্রহ করে তারা নিজস্ব পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ চালায়।
দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, সংগৃহীত উচ্চ রেজুলেশনের এসব ছবি ও ভিডিও একাধিক এআই-ডিটেকশন টুল ব্যবহার করে পরীক্ষা করা হলেও, সেগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি—এমন কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অধিকতর অনুসন্ধানে ওই হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশটে দৃশ্যমান একটি বাংলা মোবাইল নম্বর ধরে তদন্ত বাড়ায় সংস্থাটি। বিকাশ অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করে জানা যায়, নম্বরটি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের এক অমুসলিম নারীর নামীয়, যা প্রতিমন্ত্রীর নিজ গ্রামের এলাকা। পরবর্তীতে উক্ত নম্বরে যোগাযোগের মাধ্যমে জানা যায়, হোয়াটসঅ্যাপের শাড়ি পরিহিত ছবিটি ওই নারীরই। তবে ছবিটি সেখানে কীভাবে গেল বা ভাইরাল হওয়া ঘটনা বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, শৈশবে ওই নারী পিতৃহীন হওয়ার পর থেকে প্রতিমন্ত্রী তার পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সাংবাদিক অনুসন্ধানের সময় প্রতিমন্ত্রীর মোবাইল নম্বর থেকে ফোন আসলেও পরবর্তীতে বিস্তারিত জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় এবং বিষয়টিকে 'ব্যস্ততা' হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে ভাইরাল হওয়া ছবির একটিতে উপস্থিত নারী হিসেবে নিজের নাম আসার পর ফেসবুকে দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন উপস্থাপিকা মারিয়া সরকার এলিন।
তিনি লেখেন, পেশাগত কারণে বিভিন্ন সময় দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও ছবি তোলার ঘটনা ঘটে থাকে। রেড কফি শপে ধ্রুবতারা সংগঠনের একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে একই টেবিলে বসার ছবিকে বিকৃত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। ইতিপূর্বেও তার ছবি ব্যবহার করে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, কোনো পেশাগত অনুষ্ঠান বা সৌজন্য ছবিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে চরিত্রহননের এই চেষ্টা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও দণ্ডনীয় অপরাধ। তিনি এই অপপ্রচার বন্ধ না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
ঘটনার সত্যতা ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া জানতে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট গ্রামে গেলে এক ধরনের নীরবতা ও ভীতি লক্ষ করা যায়। এলাকাটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত হওয়ায় এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে গ্রামের বাসিন্দারা সংবাদমাধ্যমের সাথে খোলামেলা কথা বলতে চাননি। অনেকে ভিডিও দেখার কথা স্বীকার করলেও বিস্তারিত মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন।
বর্তমানে একদিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এবং অন্যদিকে তথ্য-প্রমাণের প্রযুক্তিগত যাচাই—সব মিলিয়ে এই ভাইরাল বিতর্ক একটি জটিল মোড়ে এসে পৌঁছেছে। অপপ্রচারের মাধ্যমে চরিত্রহনন নাকি নৈতিকতার প্রশ্ন—এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বহুমাত্রিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.