জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং স্থানীয় বিএনপির মুখোমুখি অবস্থান ও সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায়। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির আশঙ্কায় সমগ্র পৌর এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ১৪৪ ধারা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। একই স্থানে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা ও সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রশাসন এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
বুধবার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. জি এম সরফরাজ স্বাক্ষরিত এক জরুরি আদেশের মাধ্যমে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। আদেশে জানানো হয়, হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় এনসিপির পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ সমাবেশ ও পদযাত্রার সূচির বিপরীতে একই সময়ে ও একই স্থানে শান্তি সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেয় জেলা বিএনপি, সদর উপজেলা বিএনপি এবং জেলা ছাত্রদল। উভয় পক্ষের এই অনড় অবস্থানের কারণে সহিংসতা, জানমালের ক্ষতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হওয়ার তীব্র সম্ভাবনা দেখা দেয়।
জনস্বার্থ ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রশাসন পৌর এলাকায় পাঁচ বা তার বেশি ব্যক্তির একত্র হওয়া, সব ধরনের মিছিল, সভা-সমাবেশ, পিকেটিং, মাইকিং এবং উচ্চশব্দে প্রচারণাসহ উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে—এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ শহরের থানার মোড় এলাকায় এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে এক অপ্রীতিকর ঘটনার সূচনা হয়। এনসিপি নেতাদের অভিযোগ, পদযাত্রা সম্পন্ন করে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ প্রতিনিধি দল যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের একদল সশস্ত্র কর্মী তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। হামলায় এনসিপির শীর্ষ নেতা সারজিস আলম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মিডিয়া টিমের ভিডিওগ্রাফার ইউসুফ আহমেদ, প্রতিনিধি সদস্য আরাফাত সানি, গাড়িচালক আসলাম হোসাইন, কনটент ক্রিয়েটর মোশারফ এবং ভিডিও এডিটর শাহরিয়ারসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। হামলাকারীরা এনসিপির বহরে থাকা বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে এবং তাদের সংবাদ সংগ্রহের মূল্যবান সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
সহিংসতার হাত থেকে বাঁচতে এনসিপির নেতারা নিকটস্থ সোনালী ব্যাংকের একটি শাখায় আশ্রয় নেন। পরে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছে এলাকা ঘেরাও করেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাবার বুলেট ছুড়ে তাঁদের উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুরের দিকে আজমিরীগঞ্জে অনুষ্ঠিত এক কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় এনসিপির উত্তরের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিএনপি সরকারের অভ্যন্তরীণ সহিংসতা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। পরবর্তীতে বিকেলে টাউন হলের সামনে আরেক সমাবেশে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী রাজনৈতিক মন্তব্য করলে এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এনসিপি হবিগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক আবু হেনা মোস্তফা কামাল অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে ফেরার পথে পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর এই হামলা চালানো হয়। হামলাকারীদের হাতে লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র ছিল।
তবে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ। তিনি দাবি করেন, শহরের শান্তিপ্রিয় পরিবেশে বহিরাগত কেউ এসে আপত্তিকর বক্তব্য দিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চাইলে এর দায় তাদেরকেই নিতে হবে। ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মী এই ঘটনার সাথে যুক্ত নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস ও ভিডিও চিত্র প্রকাশ করেন এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি অভিযোগ করেন, হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তাঁরা কার্যকর ভূমিকা পালন করেননি। তিনি দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
বর্তমানে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে শহরজুড়ে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.