ভারতে বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার অনিয়ম ঘিরে তৈরি হওয়া জাতীয় সংকট নিরসনে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির কেন্দ্র সরকার। পরীক্ষাব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রযুক্তি খাতের দিকপাল ও ভারতের ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা 'আধার'-এর অন্যতম রূপকার নন্দন নিলেকানিকে এই গুরুত্বপূর্ণ টাস্কফোর্সের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদি এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। ভিডিও বার্তায় তিনি স্পষ্ট করেন যে, সরকারের লক্ষ্য কেবল সাময়িক সমস্যা সমাধান করা নয়, বরং ভারতের ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সংস্কার নিশ্চিত করা।
সরকারি উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানায়, নতুন গঠিত এই টাস্কফোর্সে প্রযুক্তি, প্রশাসন এবং শিক্ষাক্ষেত্রের দেশবরণ্য বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই দলের মূল কাজ হবে জাতীয় পরীক্ষা পরিচালনা সংস্থা বা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) সার্বিক কাঠামো পর্যালোচনা করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ পরীক্ষাপদ্ধতি চালুর বিষয়ে সুস্পষ্ট সুপারিশ করা।
ইনফোসিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বাধীন এই টাস্কফোর্সে আরও রয়েছেন:
এস সোমনাথ: ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ইসরো) সাবেক চেয়ারম্যান।
তপন ডেকা: ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) সাবেক পরিচালক।
ভি কামাকোটি: ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) মাদ্রাজ-এর পরিচালক।
অনিতা কারওয়াল: ভারতের সাবেক শিক্ষাসচিব।
অমৃত লাল মিনা: লজিস্টিকস বা সরবরাহ ব্যবস্থাপনাবিশেষজ্ঞ।
বিশেষজ্ঞদের এই বহুমুখী দল পরীক্ষার নিরাপত্তা, ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল এবং অনলাইন সার্ভার সুরক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা দেবে।
পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অপরাধ বন্ধে শুধু প্রশাসনিক সংস্কারই নয়, আইনি দিক থেকেও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার। প্রধানমন্ত্রী মোদি জানান, এ ধরনের অপরাধের বিচার দ্রুত শেষ করতে ইতিমধ্যেই ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সোমবার সংসদে একটি নতুন বিল উত্থাপন করতে যাচ্ছে কেন্দ্র সরকার। প্রস্তাবিত এই বিলে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের কঠোর কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১০ কোটি রুপি পর্যন্ত ভারী জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় পরীক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে নতুন রাজনৈতিক দল 'ককরোচ জনতা পার্টি'র (সিজেপি) ব্যানারে টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে বড় ধরনের বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। এই অভূতপূর্ব আন্দোলনের মুখে গত শনিবার ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা মোদি সরকারের ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো ঘটনা, যেখানে টানা আন্দোলনের জের ধরে কোনো মন্ত্রী পদত্যাগ করলেন।
তবে রবিবারের ভিডিও বার্তায় পদত্যাগী শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে মোদি কোনো মন্তব্য করেননি। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর কেন্দ্রীয় ভোক্তাবিষয়ক মন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশীকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই তিনি নয়াদিল্লির কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ভবন ‘কর্তব্য ভবনে’ কার্যালয় পরিচালনা শুরু করেন এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে মামলা প্রত্যাহার, আত্মহত্যাকারী ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং পরীক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে সরকারের এই ইতিবাচক পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করে সিজেপি তাদের চলমান আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। ফলে ভারতে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা উত্তাল পরিস্থিতি আপাতত শান্ত হওয়ার পথে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.