বর্তমান বিশ্বে চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) কিংবা জেমিনাইয়ের (Gemini) মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অভাবনীয় অগ্রগতি দেখে অনেকের মনেই সংশয় জাগছে—তবে কি চারুকলা, সংগীত, নাট্যকলা বা অন্য যেকোনো সৃজনশীল পেশার ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে? কৃত্রিম মেধা যখন মুহূর্তের মধ্যে কোডিং করা থেকে শুরু করে ছবি আঁকা বা সুর তৈরি করে দিচ্ছে, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে মানুষের তৈরি শিল্পের ভবিষ্যৎ কী? তবে গভীর বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয় অমূলক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোটি কোটি তথ্য বা ডেটা বিশ্লেষণ করে একটি নিখুঁত নকশা তৈরি করে দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের গভীর অনুভূতি, দুঃখ-বেদনা বা জীবন্ত আবেগের ছোঁয়া দেওয়ার ক্ষমতা কোনো অ্যালগরিদমের নেই।
শিল্পের মূল শক্তিই লুকিয়ে থাকে অনুভূতির আদান-প্রদানে। ক্যানভাসে চিত্রশিল্পীর তুলির শেষ আঁচড়ের পেছনের যে অনুভূতি, কিংবা মঞ্চে প্রদীপের নিচে দাঁড়িয়ে রক্তমাংসের একজন অভিনেতার চোখের জলের যে আবেদন—তা কেবল মানুষের পক্ষেই ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। এআই সুন্দর সুর তৈরি করে কান জুড়াতে পারে, কিন্তু লালনের সেই ‘অচিন পাখি’ বা মানুষের আত্মাকে নাড়া দেওয়ার ক্ষমতা কেবল মানবিক শিল্পকর্মেরই রয়েছে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কিন্তু প্রযুক্তির সাথে শিল্পের এই যুগলবন্দীকে বেশ গুরুত্বের সাথেই দেখা হচ্ছে। একসময় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত অর্থাৎ ‘STEM’ (Science, Technology, Engineering, Mathematics)-এর প্রাধান্য থাকলেও, বর্তমানে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) বা হার্ভার্ডের মতো শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যুক্ত হয়েছে ‘A’ অর্থাৎ Arts। ফলে তা এখন রূপ নিয়েছে ‘STEAM’-এ।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পেরেছেন, শুধু জটিল কোড বা ইকুয়েশন দিয়ে একটি উন্নত রোবট বা প্রোডাক্ট তৈরি করলেই চলে না; সেটি যদি দেখতে নান্দনিক না হয় এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব না বোঝে, তবে বৈশ্বিক বাজারে তা টিকতে পারবে না। এমনকি গুগল, অ্যাপল কিংবা পিক্সারের মতো জায়ান্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন কর্মীদের প্রাধান্য দিচ্ছে, যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি চারুকলা, মনস্তত্ত্ব বা নাট্যকলার গভীর জ্ঞান রয়েছে। কারণ, সাধারণ প্রযুক্তিগত কাজ এআই সহজেই করে ফেলতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন এবং উদ্ভাবনী ভাবনার (Out of the box thinking) জন্য মানুষকেই দরকার হয়।
উন্নত বিশ্ব যখন প্রযুক্তি ও শিল্পের মেলবন্ধন ঘটাচ্ছে, তখন আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। আমাদের সমাজ ও অভিভাবক শ্রেণীতে এখনো সন্তানকে ডাক্তার, প্রকৌশলী কিংবা সরকারি চাকরিজীবী বানানোর একমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে তরুণ প্রজন্ম দিন দিন যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে এবং সংবেদনশীলতা হারাচ্ছে। একটি শিশু পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো সে একজন সহমর্মী ও বিবেকবান মানুষ হতে পারছে কি না।
পাশাপাশি, আমাদের দেশের সৃজনশীল শিক্ষার কাঠামাতেও কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রথাগত পড়াশোনার বাইরে বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার জন্য যেসব আধুনিক ডিজিটাল টুলস, থ্রিডি অ্যানিমেশন কিংবা প্রেজেন্টেশন স্কিল দরকার—আমাদের শিক্ষার্থীরা সেখানে পিছিয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ঐতিহ্য ও সৃষ্টিকে কীভাবে উপস্থাপন করতে হয়, সেই দক্ষতার অভাবও প্রকট। এআই মূলত ইন্টারনেটে থাকা আগের তথ্যেরই একটি পুনর্বিন্যাস বা নকল রূপ। নতুন কিছু তৈরি করার মৌলিক ক্ষমতা একমাত্র মানুষেরই। তাই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প, রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা কিংবা আধুনিক ডিজিটাল আর্টের সঠিক সমন্বয় ঘটাতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে হবে।
প্রযুক্তির যুগে বেঁচে থাকার জন্য এবং সমাজকে হিংস্রতা থেকে রক্ষা করার জন্য শিল্পচর্চার বিকল্প নেই। এআই মানুষকে কোটি কোটি তথ্য সরবরাহ করতে পারে, কিন্তু 'মানুষ' হওয়া শেখাতে পারে না। রোবটের ভিড়ে একজন মানবিক ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের মানুষ হিসেবে নিজেকে টিকিয়ে রাখাই এখন আসল চ্যালেঞ্জ—আর সেই লড়াইয়ে জয়ী হবে সৃজনশীলতার শক্তিই।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.