ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (ডায়রা) আয়োজিত 'বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্স'-এর দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় দেশের সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। 'প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, ক্ষমতার ভারসাম্য: মানবাধিকার সুরক্ষায় টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ' শীর্ষক এই প্যানেল আলোচনায় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, সংসদ সদস্য এবং সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
প্যানেল আলোচনায় প্রধান বক্তা হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন দেশের নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিচার বিভাগের জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে যেমন কোনো স্বাধীন তদন্ত কমিটি বা প্রক্রিয়া নেই, ঠিক একইভাবে বিচারকদের ক্ষেত্রেও কোনো কার্যকর স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায় না।
বিচারকদের অপসারণ ও তদন্তের জন্য দেশে একটি 'সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল' ব্যবস্থা থাকলেও সেটির কার্যপদ্ধতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই কাউন্সিলের পুরো প্রক্রিয়াটি আদৌ স্বচ্ছ নয়। বিচারকদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে তার ভিত্তিতে কী তদন্ত হচ্ছে বা কীভাবে বিচারিক প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, তা সাধারণ মানুষ কিংবা অংশীজনদের জানার কোনো সুযোগ থাকে না।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের প্রস্তাবিত খসড়া থেকে নিরাপত্তা বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনার বিধান বাদ পড়া প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, অতীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর কমিশন গঠনের দারুণ সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যা হাতছাড়া করা হয়েছে। তবে বর্তমান খসড়াটি পূর্ববর্তী খসড়ার তুলনায় কিছুটা দুর্বল হলেও ২০০৯ সালের বিদ্যমান আইনের চেয়ে বেশ শক্তিশালী বলে তিনি অভিমত দেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ডেপুটি রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টিটিভ সোনালী দয়ারত্নে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত স্বাধীনতার ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, কেবল কাগুজে বা আইনি ক্ষমতা বাড়ালেই কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যকর হয়ে ওঠে না; বরং নির্বাহী বিভাগের অহেতুক প্রভাব কমানো অত্যন্ত জরুরি।
সোনালী দয়ারত্নে বলেন, এসব সংস্থায় নেতৃত্ব নির্বাচন, জনবল নিয়োগ, বাজেট বরাদ্দ এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনীতি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে যদি মেধাভিত্তিক এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালু করা যায়, তবেই সাধারণ জনগণের মাঝে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা ফিরে আসবে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন 'মায়ের ডাক'-এর সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, দেশের আইনি কাঠামোকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে যেন সেখানে কোনো ধরনের আইনি ফাঁকফোকর না থাকে। রাষ্ট্রকে অন্যায় স্বীকার করে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের পাশাপাশি তাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানান তিনি। তিনি স্পষ্ট করেন, যেসব নাগরিক ন্যায়ের দাবিতে রাজপথে দাঁড়াচ্ছেন, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাদের কণ্ঠস্বরকে স্থান দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
অন্যদিকে, গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বিস্তারিত আলোচনা করেন কীভাবে প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনে নিরাপত্তা বাহিনীকে দায়মুক্তির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আইন ও বিচার বিভাগীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আখতার হোসেন সাংবিধানিক পদে নিয়োগের জন্য সরকার, বিরোধী দল ও তৃতীয় বৃহত্তম দলের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের চার্জ দ্য এফেয়ার্স দিপেক এলমার জানান, একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন শুধু সাধারণ মানুষের জন্যই নয়, বরং সরকার ও বিরোধী দল সবার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যই কল্যাণকর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান পুরো প্যানেল আলোচনাটি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.