
কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস বা সিএনজি বিক্রিতে কমিশন বৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয় সমন্বয়ের দাবিতে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। আগামী ৩০ জুলাই মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত টানা ১৮ ঘণ্টা সারা দেশে সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি আদায় না হলে আগামী ২৩ আগস্ট থেকে সারা দেশে একযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।
রাজধানীর বিজয়নগরের আকরাম টাওয়ারে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সিএনজি মালিকদের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য গঠিত বিশেষ স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক আমিরুজ্জামান চৌধুরী লিখিত বক্তব্যে ধর্মঘট ও পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়টি তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসোসিয়েশনের শীর্ষ নেতারা জানান, দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সিএনজি খাতে কমিশন সমন্বয় করা হয়নি। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে ফিলিং স্টেশনগুলোর জন্য ৮ টাকা কমিশন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির পারদ কয়েক ধাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।
একইসঙ্গে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, স্টেশনের যন্ত্রাংশের দাম, প্রয়োজনীয় ব্যাংক কমিশন, সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) জমির ইজারা মাশুল এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের লাইসেন্স নবায়ন ফি বহুগুণ বেড়েছে। ফলে পুরোনো কমিশনের আয় দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিলিং স্টেশন পরিচালনা করা ব্যবসায়ীদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ঘনমিটারে কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা নির্ধারণ করা জরুরি। অর্থাৎ, প্রতি ঘনমিটারে বিদ্যমান কমিশনের চেয়ে ৫ টাকা ৯৬ পয়সা বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির অন্যান্য প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে:
স্বয়ংক্রিয় কমিশন সমন্বয়: ভবিষ্যতে কখনো গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে কমিশনের হারও আনুপাতিক হারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি করতে হবে।
অতিরিক্ত জামানত বন্ধ করা: গ্যাসের নতুন মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে পুরোনো গ্রাহকদের কাছ থেকে বারবার বাড়তি জামানত নেওয়ার প্রক্রিয়ার অবসান ঘটাতে হবে।
ফি পুনর্নির্ধারণ: সড়ক ও জনপথ বিভাগের জমির ইজারা ফি এবং সরকারি দপ্তরগুলোর লাইসেন্স মাশুল একটি যৌক্তিক ও সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর স্পষ্ট করেন যে, তারা ব্যবসার জন্য অতিরিক্ত কোনো মুনাফা দাবি করছেন না। সরকারি কমিটির আগের প্রতিবেদন, বর্তমান মূল্যস্ফীতি এবং প্রকৃত পরিচালন ব্যয় বিশ্লেষণ করেই এই দাবি নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালে গঠিত একটি সরকারি কমিটি ফিলিং স্টেশনের জন্য প্রতি ঘনমিটারে অতিরিক্ত ১ টাকা ৯৮ পয়সা মার্জিনের সুপারিশ করেছিল। সেই হিসাবকে মূল ধরে মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের মজুরি এবং যন্ত্রাংশের দামের সঙ্গে মেলালে ২০২৪ সালের শুরুতেই এই ন্যায্য মার্জিন দাঁড়ায় ৩ টাকা ৭০ পয়সা।
এর সঙ্গে সরকারের পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গ্যাসের আনুপাতিক সমন্বয়ের ৩ টাকা ৩০ পয়সা এবং বিদ্যুতের দাম ৮ দফায় বৃদ্ধির কারণে সৃষ্টি হওয়া ২ টাকা ৪৬ পয়সা যুক্ত হলে দাবির ভিত্তি স্পষ্ট হয়। সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের প্রারম্ভেই প্রতি ঘনমিটারে অতিরিক্ত ৫ টাকা ১০ পয়সা পাওয়ার কথা ছিল।
তদুপরি, গত জুন মাসে বিদ্যুতের দাম এক লাফে ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতি ঘনমিটারে পরিচালন খরচ আরও ৮৬ পয়সা বেড়ে গেছে। এই সমস্ত হিসাব যোগ করেই ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা কমিশন নির্ধারণের ন্যায্য দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে।
মালিক সমিতির নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ন্যায্য দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার লিখিত আবেদন করা হলেও প্রশাসনিক কোনো সাড়া মেলেনি। এমনকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ বা আলোচনার সুযোগও দেওয়া হয়নি।
আলোচনার সকল দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে গত ১৮ জুলাই এক জরুরি সাধারণ সভার আয়োজন করা হয়। সভা থেকে ১২ সদস্যের একটি শক্তিশালী স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়, যার সিদ্ধান্তের আলোকেই এই দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনোরঞ্জন ভক্তসহ সারাদেশ থেকে আগত প্রতিনিধি ও জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ৩০ জুলাইয়ের কর্মসূচির পরও যদি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক আলোচনা বা সমঝোতা না আসে, তবে ২৩ আগস্টের পর থেকে সারাদেশে সিএনজি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.