
নিজস্ব প্রতিবেদক: চোখের পলকে কেটে গেছে একটি বছর, কিন্তু সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। গত বছরের ২১ জুলাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ভেতরে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর থমকে গিয়েছিল পুরো দেশ। আগামীকাল মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সেই মর্মান্তিক ও বেদনাবিধুর ঘটনার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই বিশেষ দিনটিকে সামনে রেখে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনায় কান্নায় ভেঙে পড়েন সহপাঠী ও শিক্ষকেরা।
আজ সোমবার সকালে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ি প্রধান ক্যাম্পাসে এক আবেগঘন পরিবেশে দোয়া ও স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন শত শত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা। দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসের পাশাপাশি একযোগে প্রতিষ্ঠানের বাকি ১৬টি শাখাতেও সমসাময়িক সময়ে এই বিশেষ দোয়া ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।
স্মরণসভায় কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম খান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, "শিক্ষার্থীরা তাদের হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করতে আজ এখানে হাজির হয়েছে। তারা নিহত সবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছে এবং যারা এখনও চিকিৎসাধীন বা মানসিকভাবে ট্রমার মধ্যে রয়েছে, তাদের দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য বিশেষ প্রার্থনা করেছে।"
ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনার এক বছর পূর্তিতে নিহতদের প্রতি সম্মান ও সংহতি জানাতে দুই দিনের বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ। অধ্যক্ষ জানান, কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামীকাল মঙ্গলবার দুর্ঘটনাস্থলটি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। সেখানে স্কাউট ও রোভার স্কাউটের সদস্যরা নিহতদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদর্শন করবেন।
এছাড়াও কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পুষ্পস্তবক অর্পণ, এক মিনিটের নীরবতা পালন, বিশেষ দোয়া এবং স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান। নিহত শিক্ষার্থীদের ছবি, তাদের ব্যবহার করা নানা জিনিস এবং বন্ধুদের উদ্দেশ্যে লেখা স্মৃতিকথা ও বিভিন্ন আবেগঘন বার্তা প্রদর্শনীর জন্য রাখা হবে বলে কলেজ কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
আজকের স্মরণসভায় স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সূর্য সময় বিশ্বাস। সেদিনের অবরুদ্ধ সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে সূর্য বলে, "যুদ্ধবিমানটি যখন বিধ্বস্ত হয়, তখন আমরা দোতলার একটি ক্লাসরুমে আটকা পড়েছিলাম। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে আগুন ধরে যায়, কালো ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। আহত বন্ধুদের আর্তনাদে চারপাশের পরিস্থিতি ছিল এক নারকীয় নরকের মতো।"
সে আরও জানায়, "শিক্ষকেরা আমাদের বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লোহার গ্রিল ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন। পরে বাইরের উদ্ধারকারীদের দূর থেকে ইশারা পেয়ে আমি সহপাঠীদের নিয়ে কোনোমতে নিরাপদে বের হতে পেরেছিলাম।" নিহত সহপাঠীদের মনে করে সূর্য অশ্রুসিক্ত চোখে বলে, "আমি কখনোই আমার সেই বন্ধুদের ভুলতে পারব না।"
গত বছরের ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভেতরে আকস্মিকভাবে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান আছড়ে পড়ে। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ হারান মোট ৩৬ জন মানুষ। যার মধ্যে ২৮ জনই ছিলেন ওই বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থী। এই দুর্ঘটনায় নিহত হন যুদ্ধবিমানটির চালক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও। ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও, আহত হওয়া অনেক শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শী এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। শারীরিক ক্ষত শুকিয়ে গেলেও মনের ভেতরের সেই ট্রমা এবং আতঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকেই।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.