
বিশেষ প্রতিবেদন, রংপুর: ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দুই বছর সময় পার হয়ে গেছে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন একসময় রূপ নিয়েছিল ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে। দীর্ঘ ৩৬ দিনের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট পতন ঘটেছিল তৎকালীন সরকারের। এরপর নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আন্দোলনকারী নিহতদের 'জুলাই শহীদ' এবং আহতদের 'জুলাই যোদ্ধা' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু আজ ২০২৬ সালের এই মধ্যসময়ে এসেও একটি বড় প্রশ্ন দেশের মানুষকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে—জুলাই অভ্যুত্থানে ঠিক কত মানুষ শহীদ হয়েছিলেন? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর খুঁজতে গিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গবেষকরাও এক ধরণের বিভ্রান্তির মুখে পড়ছেন।
সরকারি গেজেটের তথ্য ও নামের রদবদল সরকারি নথিপত্র এবং গেজেট অনুযায়ী, জুলাই শহীদের সংখ্যাটি নির্দিষ্ট একটি গণ্ডির মধ্যে ওঠানামা করছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রথম দফায় ৮৩৪ জন শহীদের তালিকা প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে জুনে আরও ১০ জনের নাম যুক্ত হয়ে তা দাঁড়ায় ৮৪৪ জনে। কিন্তু এখানেই তালিকা চূড়ান্ত হয়নি।
চলতি বছরের শুরুতে অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে যাচাই-বাছাইয়ের পর গেজেট থেকে কয়েকজনের নাম বাদ পড়ে। আবার এপ্রিল মাসে নতুন করে ১২ জনের নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সর্বশেষ ১৩ মে আরও একটি নাম বাদ দেওয়ার পর সরকারি গেজেট অনুযায়ী বর্তমানে জুলাই শহীদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪৩ জনে। অন্যদিকে সরকারি হিসাবে নিবন্ধিত আহত মানুষের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৭০ জন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যাচাই-বাছাইয়ের সময় কিছু নাম দুবার আসায় এবং কয়েকজন আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকায় তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। তবে এই প্রক্রিয়ায় যে গেজেট নম্বরগুলো ফাঁকা হয়েছে, সেখানে আর নতুন কোনো নাম যুক্ত হবে না।
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সংগঠনের তথ্যের ভিন্নতা সরকারি গেজেটের বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শহীদের যে সংখ্যা দাবি করা হচ্ছে, তার সঙ্গে সরকারি হিসাবের বড় অমিল রয়েছে। সবচেয়ে বেশি যে দুটি সংখ্যা আলোচনায় আসে, তা হলো ‘১ হাজার ৪০০’ এবং ‘২ হাজারের বেশি’।
গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর)-এর তথ্যানুসন্ধানী দল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ জনে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে, সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিজেই বিভিন্ন সময়ে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে শহীদের সংখ্যা কোথাও এক হাজার, কোথাও দেড় হাজার, আবার কোথাও হাজার হাজার বলে উল্লেখ করেছেন।
বেসরকারি ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করা 'জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন'-এর ওয়েবসাইটে ৮২০ জনের বেশি শহীদের কথা বলা হলেও তাদের তালিকায় নাম রয়েছে ৮৩৫ জনের। আবার 'জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স' নামক একটি সংগঠনের দাবি, এই আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছেন দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ।
তালিকায় বিলম্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, শহীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা সম্পূর্ণরূপে সরকারের দায়িত্ব। রাষ্ট্রের নিজস্ব তথ্যে যদি কোনো ঘাটতি থাকে, তবে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার ডাটা যাচাই করে হলেও দ্রুত একটি নির্ভুল তালিকা প্রকাশ করা উচিত। কারণ এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ, জনঅর্থের সঠিক ব্যবহার এবং সর্বোপরি ইতিহাসের এক বিশাল দায়বদ্ধতা।
বর্তমানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই মুহূর্তে নতুন কোনো শহীদের আবেদন তাদের কাছে জমা নেই, তবে আহতদের তালিকায় আরও ১ হাজারের বেশি মানুষের নাম যুক্ত হতে পারে। জনবল সংকটের কারণে মাঠ পর্যায়ের কাজগুলো ধীরগতিতে চলছে বলে স্বীকার করেছে অধিদপ্তর। তবে স্থগিত থাকা যাচাই-বাছাই কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা খুব দ্রুতই চূড়ান্ত তালিকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.