
ফুটবলবিশ্বে ব্রাজিল এমন এক দেশ, যেখানে প্রায় প্রতিটি নাগরিকই নিজেকে একজন নিখুঁত ফুটবল কোচ বা বোদ্ধা মনে করেন। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ডাগআউটে বসা মানেই চব্বিশ ঘণ্টা সমালোচনার আতশিকাঁচের নিচে থাকা। সেলেসাওদের বর্তমান ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তিও এর ব্যতিক্রম নন। তবে শত সমালোচনা আর চাপের মুখেও নিজের চেনা রসবোধ ও ব্যক্তিত্ব হারাননি এই প্রবীণ কোচ। সম্প্রতি ব্রাজিলের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘ফোলিয়া দে সাও পাওলো’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রোল ও সমালোচনা নিয়ে এক হাত নিয়েছেন তিনি। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ডাগআউটে তাঁর যে অভিজ্ঞতা, তাতে তাঁকে ফুটবল শেখানোর যোগ্যতা এই গ্রহে কেবল একজন মানুষেরই রয়েছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে জাপানের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে বিরতির পর আনচেলত্তির দুর্দান্ত কৌশলগত পরিবর্তন বা ‘মাস্টার ক্লাস’ যখন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে, ঠিক তখনই তাঁর দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল একটি বিতর্কিত প্রশ্ন—ব্রাজিলিয়ান সমর্থকেরা কি বদ্দ বিরক্তিকর এবং তারা কি কোচের চেয়েও ফুটবল বেশি বোঝে? ৬৭ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি কোচ উত্তরটা দিয়েছেন বেশ রাজকীয় ঢঙে। নিজের ১,৪০০-র বেশি ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “আমি ফুটবল কতটুকু বুঝি তা বিচার করার অধিকার কারও নেই। তবে এই গ্রহে আমার চেয়ে বেশি ম্যাচ ডিল করার অভিজ্ঞতা আছে কেবল একজনের—তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন, যিনি দুই হাজারের বেশি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। তাই সবার পরামর্শ আমি শুনলেও, আমাকে উপদেশ দেওয়ার যোগ্যতা যদি কারও থাকে, তিনি শুধুই ফার্গুসন।”
[caption id="attachment_2335" align="alignleft" width="300"]
ব্রাজিল জাতীয় দলের সঙ্গে কোচ কার্লো আনচেলত্তি-এএফপি[/caption]
ব্রাজিলের ডাগআউটে এক বছর পূর্ণ করা এই ইতালিয়ান কোচ লাতিন আমেরিকার এই দেশটির সংস্কৃতি ও মানুষের ভালোবাসায় মজেছেন। ফুটবল নিয়ে তাদের তীব্র আবেগ যেমন মাঝেমধ্যে মাত্রা ছাড়ায়, তেমনি তাদের বিনয় ও উৎসবমুখর পরিবেশ আনচেলত্তিকে মুগ্ধ করেছে। বিখ্যাত রিও কার্নিভ্যালের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি বলেন, “ব্রাজিলিয়ানরা আসলে কেমন, এই কার্নিভ্যালই তার প্রমাণ। তারা অত্যন্ত আনন্দপ্রিয়, সুশৃঙ্খল এবং বিনয়ী। আমার মেডিকেল স্টাফ থেকে শুরু করে কারিগরি দল—সবখানেই ব্রাজিলিয়ানরা আছেন এবং তাদের কেউ অহংকারী নন। এমন চমৎকার মানুষ পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।”
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব বা শেষ ১৬-র হাইভোল্টেজ ম্যাচে আগামী রোববার দিবাগত রাত দুইটায় (বাংলাদেশ সময়) নরওয়ের মুখোমুখি হচ্ছে সেলেসাওরা। প্রতিপক্ষ দলে আছেন বর্তমান ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বিধ্বংসী স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড। তবে ম্যান সিটির এই গোলমেশিনকে নিয়ে চিন্তিত হলেও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর আনচেলত্তি। নকআউটের মরণ-বাঁচন লড়াই নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, “বিশ্বকাপের এই পর্যায়ে কোনো ম্যাচই সহজ নয়। এখানে কেবল কৌশল নয়, মানসিক দৃঢ়তা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। নরওয়ে যথেষ্ট শক্তিশালী দল এবং হলান্ড এই মুহূর্তের অন্যতম সেরা। তবে আমরা আমাদের সেরাটা দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটতে শতভাগ প্রস্তুত।”
জাপানের বিপক্ষে ম্যাচে দলের পোস্টার বয় নেইমারকে পুরো ৯০ মিনিট বেঞ্চে বসিয়ে রাখা নিয়ে ব্রাজিলের ফুটবল মহলে কম জলঘোলা হয়নি। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, চোট থেকে ফেরা নেইমার কি তবে পুরোপুরি ফিট নন? এই সমস্ত ধোঁয়াশা এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন কোচ। আনচেলত্তি নিশ্চিত করেছেন যে, নেইমার সম্পূর্ণ ফিট এবং প্রয়োজনে পুরো ৯০ মিনিট খেলার সামর্থ্য তাঁর রয়েছে।
নেইমারের বেঞ্চে বসে থাকার মানসিকতা নিয়ে আনচেলত্তি বলেন, “একজন তারকা খেলোয়াড় বেঞ্চে বসে সুখী হবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নেইমার অত্যন্ত পেশাদার আচরণ করছে। ও অনুশীলনে দারুণ এবং সতীর্থদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। ও যে মাঠে নামার জন্য ক্ষুধার্ত, সেটা ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখলেই বোঝা যায়। আর এটা দলের জন্য একটা ইতিবাচক দিক। ও বিনয়ী এবং দলের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সঠিক সময়েই ওকে মাঠে ব্যবহার করা হবে।” সমালোচনার জবাব আর মাঠের কৌশলে আনচেলত্তি যেভাবে দলকে এগিয়ে নিচ্ছেন, তাতে হেক্সা মিশনের স্বপ্ন আরও ঘনীভূত হচ্ছে ব্রাজিলিয়ান ভক্তদের মনে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.