
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে র্যাগিংয়ের অপসংস্কৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ৫৫তম আবর্তনের (প্রথম বর্ষ) নবীন শিক্ষার্থীদের গভীর রাতে খেলার মাঠে ডেকে নিয়ে ‘ম্যানার’ বা শিষ্টাচার শেখানোর নামে তীব্র শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শুক্রবার রাত ১১টা থেকে শুরু করে দিবাগত রাত ২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে।
খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম এবং জাকসুর (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) অ্যান্টি-র্যাগিং সেলের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে অভিযান চালান। এ সময় র্যাগিংয়ে জড়িত থাকার অপরাধে একই বিভাগের ৫৪তম আবর্তনের (দ্বিতীয় বর্ষ) ১২ জন শিক্ষার্থীকে হাতেনাতে আটক করা হয়। আটককৃত শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে নিরাপত্তা কার্যালয়ে লিখিতভাবে ও ভিডিও জবানবন্দিতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছেন। এই ঘটনায় আজ শনিবার ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে প্রক্টর বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাতে ইতিহাস বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের সিনিয়র শিক্ষার্থীরা নতুন ভর্তি হওয়া ৫৫তম ব্যাচের নবীনদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে ডেকে পাঠান। সেখানে যাওয়ার পরপরই শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক হেনস্তা। কান ধরে দাঁড়িয়ে রাখা, বাবা-মাকে তুলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং ফরমাল পোশাকের নিয়ম শেখানোর অজুহাতে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয় নবীনদের।
নির্যাতনের শিকার ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. এহসানুল হক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “আমাদের গভীর রাতে মাঠে ডেকে নিয়ে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। আমাদের বাবা-মা তুলে অত্যন্ত নোংরা ভাষায় গালাগাল করা হয়। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের একপর্যায়ে আমরা অত্যন্ত অসহায় বোধ করছিলাম। পরে প্রক্টর স্যার ও জাকসুর প্রতিনিধিরা এসে আমাদের উদ্ধার না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।”
আরেক ভুক্তভোগী রাজ খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এটিই প্রথম নয়। এর আগেও সেন্ট্রাল ফিল্ডে (কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ) আমাদের গভীর রাত পর্যন্ত আটকে রেখে মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সেমিনার রুম, ক্লাসরুমের করিডর, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এবং আবাসিক হলে চলাচলের ওপরও সিনিয়ররা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল। আমরা ক্যাম্পাসে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছি না। আমরা এই জঘন্য ও নিয়মতান্ত্রিক হেনস্তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
মাঠে নির্যাতন চলার সময় এক নবীন শিক্ষার্থী অত্যন্ত চতুরতার সাথে জাকসুর কার্যকরী সদস্য মোহাম্মদ আলী চিশতির কাছে খবর পৌঁছে দেন। খবর পাওয়া মাত্রই জাকসুর অ্যান্টি-র্যাগিং সেল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম মাঠে উপস্থিত হয়। প্রশাসনের আকস্মিক উপস্থিতিতে ঘটনাস্থল থেকেই ১২ জন অভিযুক্তকে হাতেনাতে ধরে ফেলা হয়।
আটককৃতদের তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ইতিহাস বিভাগের ৫৪তম আবর্তনের শ্রেণি প্রতিনিধির (সিআর) স্বাক্ষরিত একটি যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা সবাই ইতিহাস বিভাগের ৫৫তম আবর্তনের ১৩ জন ছাত্রকে ম্যানার শেখানোর নামে স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে ডেকে নিয়ে র্যাগ দেই।”
বিবৃতিতে অভিযুক্ত ১২ শিক্ষার্থীর নাম ও পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন— সুভাশীষ রায়, নাছিম উদ্দিন মজুমদার, আবু আবতাহী অনিক, নাইমুল হাসান, আবদুল্লাহ মাহদী, ইসফাক হাদী, মো. রায়হান খান, কাজী শাহ জামসেদ আলম, সাইফুল্লাহ মানসুর আনান, মো. মাহফুজুর রহমান, কার্তিক চন্দ্র রায় এবং নাইম আহমেদ।
ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক গণমাধ্যমকে বলেন, “রাত আনুমানিক ২টার দিকে আমরা তথ্য পেয়ে দ্রুত স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে যাই। সেখানে র্যাগিংয়ের সত্যতা পেয়ে অভিযুক্তদের হাতেনাতে ধরি। এরপর তাদের নিরাপত্তা অফিসে নিয়ে এসে ভিডিও ও লিখিত স্টেটমেন্ট নেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত তথ্য ও প্রমাণ প্রক্টরিয়াল বডির সভায় বিস্তারিত আলোচনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হবে। সেই অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চূড়ান্ত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম এই বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিংয়ের কোনো স্থান নেই। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এই বিষয়ে অত্যন্ত দ্রুত এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।”
ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং দোষীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি তুলেছেন। তাদের মতে, র্যাগিংয়ের মতো অমানবিক প্রথা বন্ধ করতে প্রশাসনকে এখনই কঠোরতম উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.